প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলার বুকে আবারও যেন ফিরে এলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। দীর্ঘ তিন দশকের অধিক সময় পর, ২০২৬ সালের শীতের প্রথম প্রহরে, জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে আবির্ভূত হলেন এক নতুন ব্যক্তিত্ব, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডাক্তার জুবাইদা রাহমান। ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রীর “ফার্স্ট লেডী” মর্যাদা লাভ করেছিলেন। কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে ওঠা সেই নারী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনির্বাণ শিখা। তাঁর পুণ্য স্মৃতির উত্তরসূরি এখন তাঁরই পুত্রবধূ, ডাক্তার জুবাইদা রাহমান।
সময়ের পরিক্রমায়, বাংলাদেশ আবারও দেখছে এক নতুন নক্ষত্রের উদয়। ডাক্তার জুবাইদা রাহমান, যিনি শুধু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রাহমানের সহধর্মিণীই নন, বরং একজন এমবিবিএস ডাক্তার, সুশিক্ষিত, মেধাবী এবং আধুনিক মানসিকতার অধিকারী নারী। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর কবিতার পংক্তি গুলোকে, কবি লিখেছিলেন, একজন পুরুষের সাফল্যের পেছনে তাঁর অর্ধাঙ্গিনীর অবদান অনস্বীকার্য এবং সাফল্যের অর্ধেকের অংশীদার তারই জীবন সঙ্গিনী। ডাক্তার জুবাইদা রাহমান যেন কবির সেই পংক্তিমালার এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি, যিনি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় স্বামীর পাশে ছায়ার মতো থেকে প্রতিটি সংকটকে জয় করে এসেছেন।
বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে সিলেটের মাটি। ডাক্তার জুবাইদা রাহমানের পৈতৃক নিবাস সিলেট বিভাগের সদর দক্ষিণ সুরমায়। তাঁর পিতা প্রয়াত রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান ও একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সফল মন্ত্রী হিসেবে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। দেশসেবক এই পিতার কন্যা ডাক্তার জুবাইদা রাহমান। তাঁর চরিত্রে ফুটে ওঠে সিলেটের মাটির গভীর ঐতিহ্য, শান্ত ও ভদ্র আচরণ, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছেও অত্যন্ত আপন করে তুলেছে।
বিগত ২১শে জানুয়ারি, ২০২৬, ইতিহাস আরেকটি মোড় নেয়। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রাহমান, নির্বাচনী প্রচারণার প্রত্যয় নিয়ে সিলেট সফর করেন। সেদিন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ময়দান যেন এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে ওঠে। লক্ষ লক্ষ মানুষের স্রোত, আর তাদের কণ্ঠে কণ্ঠে মিলে সৃষ্টি করে অভিনব এক সম্মোধন, “দুলাভাই”, “দুলাভাই”। হাজারো কণ্ঠের সেই ধ্বনি যেন আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে নাচিয়ে তুলেছিল। এই একটি শব্দের মাধ্যমেই সিলেটের জনতা তাদের হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীকে, তাদের মাটির কন্যা ডাক্তার জুবাইদা রাহমানকে। জনতার এই আন্তরিক সম্মোধন প্রমাণ করে, তাঁরা ডাক্তার জুবাইদা রাহমানকে শুধু আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং নিজেদের মেয়ে ও বোনের মর্যাদায় বরণ করে নিয়েছেন।
ডাক্তার জুবাইদা রাহমান দীর্ঘ ১৭ বছর স্বামীর সঙ্গে প্রবাস জীবনে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ছিলেন জনাব তারেক রাহমানের একমাত্র অবলম্বন, তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী। ওয়ান ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে জনাব তারেক রাহমান যখন দৈহিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতিত হন, প্রবাসের সেই কঠিন সময়ে তিনি স্বামীর পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে সুস্থ করে তুলেছেন। পাশাপাশি, তিনি গড়ে তুলেছেন তাঁদের সুযোগ্য কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রাহমানকেও। এই দীর্ঘ ও বেদনাঘন অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিণত করেছে এক দৃঢ়চেতা, ধৈর্যশীল ও সহমর্মিতার ব্যক্তিত্বে, যা বর্তমানে একজন জাতীয় নেতার সহধর্মিণীর জন্য নিতান্তই অপরিহার্য।
ঠিক যেমন করে যথার্থ ভূমিকা রেখেছিলেন মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭১ সালে। চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় অবস্থিত অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইফতেখার খান জানজুয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনুগত ছিলেন। ২৫শে মার্চের পর পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঙালি সেনা অফিসার ও সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে উদ্যত হয়। ২৭শে মার্চ, পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র জমা নিতে আসে। কিন্তু অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা বাঙালি সৈন্যরা কঠোর সিদ্ধান্তের সম্মুখীন হন। অষ্টম বেঙ্গলের দ্বিতীয় কমান্ডিং অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া অসীম সাহসিকতার সাথে নির্দেশ দেন যে, মেজর জিয়াউর রহমানের অনুমতি ছাড়া অস্ত্রাগারের একটি তালাও খোলা যাবে না বা একটি অস্ত্রও পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। এই দৃঢ় ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কারণেই অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্র লুণ্ঠন থেকে রক্ষা পায় এবং পরবর্তীতে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান। গবেষকরা মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার এই সিদ্ধান্ত না নিলে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরো ব্যাটালিয়ন নিরস্ত্র হয়ে যেত এবং স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধ পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হতে পারত। এ কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও অভিহিত করা হয় ।
ডাক্তার জুবাইদা রাহমান সেই মহিয়সী দেশমাতার পুত্রবধূ। তিনিও ঠিক তেমনিভাবে মৃদুভাষী কিন্তু পাহাড়ের মতো অটল এবং ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার অধিকারী। তিনি শিখেছেন কীভাবে জীবনের প্রতিটি বাধার মোকাবিলা করতে হয়, কীভাবে পাহাড়ের মতো দৃঢ়তার সাথে জীবনসাথীর পাশে দেশ ও জাতির স্বার্থে দাঁড়াতে হয় এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সিলেট সফরের দিনে জনতার এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আর কোনো প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ রংধনু থেকে বেগুনী রং কেড়ে নিয়ে সেই রঙের বর্গাকৃতির সীল দিয়ে ব্যালট পেপারে যেন ভালোবাসার আল্পনা এঁকে দিয়েছিল। এই জনসমর্থনের ফলেই সিলেট বিভাগের আঠারোটি আসনে আঠারোজন মেম্বার অফ পার্লামেন্ট নির্বাচিত হয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এটি ছিল “দুলাভাই” সম্বোধনের সেই স্নেহেরই প্রতিফলন।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হিসেবে ডাক্তার জুবাইদা রাহমানের আবির্ভাব শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; এটি এক নবযুগের সূচনা। তাঁর পাণ্ডিত্য, বুদ্ধিমত্তা ও শালীনতা বাংলাদেশের নারীসমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমরা আশা করি, ডাক্তার জুবাইদা রাহমান বেগম খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশের কল্যাণে ও নারীসমাজের উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখবেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখবেন।