একুশ ঘিরে সাজছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার প্রস্তুতি

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রক্তে লেখা ইতিহাসের সেই অমর দিন আবারও ফিরে আসছে জাতির দুয়ারে। ভাষার অধিকারের জন্য আত্মোৎসর্গ করা শহীদদের স্মরণে গোটা দেশ প্রস্তুত হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগে। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, যেখানে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে সাজসজ্জা, সংস্কার ও নান্দনিক প্রস্তুতির ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে ঐতিহাসিক এই স্মৃতিস্তম্ভ যেন আবারও নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে মানুষের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতায়।

প্রতিবছরের মতো এবারও ভাষা শহীদদের স্মরণে লাখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। সেই বিশাল জনসমাগমকে সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো হাতে নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে মিনারের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাদা রঙের নতুন প্রলেপে ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে মিনারের মূল কাঠামো, যেন ইতিহাসের পবিত্রতা আবারও নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে। কর্মরত শ্রমিকদের ব্যস্ততা দেখে বোঝা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে তারা কতটা আন্তরিক।

কাজের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মী জানান, দিনরাত পালাক্রমে কাজ চলছে যাতে কোনো অংশ অসম্পূর্ণ না থাকে। তিনি বলেন, শুধু রং করা বা মেরামত নয়, পুরো পরিবেশকে পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন রাখার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। কারণ একুশের দিন এখানে আসা প্রতিটি মানুষ যেন একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন, সেটাই তাদের লক্ষ্য।

শহীদ মিনারের পেছনে স্থাপন করা হবে প্রতীকী লাল সূর্য, যা বায়ান্নর আন্দোলনের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রং করার কাজ শেষ হলেই এই প্রতীকী সূর্য স্থাপন করা হবে। এটি স্থাপন করা হলে মিনারের নান্দনিক সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ঐতিহাসিক আবহকে আরও জীবন্ত করে তুলবে।

প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শিল্পসজ্জা। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এর শিক্ষার্থীরা প্রাঙ্গণে এসে শুরু করেছেন আলপনা আঁকার কাজ। তাদের তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে বর্ণময় নকশা, প্রতীক ও ভাষা আন্দোলনের স্মারক চিত্ররূপ। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা যেন এক শিল্পকর্মশালায় পরিণত হয়েছে। কেউ রঙ মিশাচ্ছেন, কেউ রেখা টানছেন, কেউ আবার নকশা পরিকল্পনা করছেন—সব মিলিয়ে পরিবেশে সৃষ্টি হয়েছে সৃজনশীলতার এক অনন্য আবহ।

চারুকলার ডিন ড. আজহারুল ইসলাম জানান, শহীদ মিনারের পাদদেশে আলপনা আঁকার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী দিনে মিনারের আশপাশের সড়কেও শিল্পসজ্জা করা হবে, যাতে আগত মানুষের চোখে ধরা পড়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনা। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন মনীষীর বাণী দেয়ালে প্রতিস্থাপন করা হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের আদর্শ সম্পর্কে অনুপ্রাণিত হতে পারে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে বিপুল জনসমাগমের মধ্যেও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। প্রতিবারের মতো এবারও একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। এই বিপুল মানুষের উপস্থিতি নির্বিঘ্ন করতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ নির্ধারণ এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গের এমন দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাই এই দিনটি ঘিরে আবেগ, গৌরব ও শোকের মিশেলে তৈরি হয় এক অনন্য অনুভূতি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। শহীদ মিনার সেই অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ কেবল শ্রদ্ধা জানায় না, বরং নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও নতুন করে উপলব্ধি করে।

রাজধানীর বাসিন্দাদের অনেকেই প্রতিদিন কাজ শেষে বা অবসরে শহীদ মিনার এলাকায় এসে প্রস্তুতির দৃশ্য দেখছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে দেখছেন সাজসজ্জার অগ্রগতি। তাদের অনেকেই মনে করছেন, এই প্রস্তুতি শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং জাতির সম্মিলিত শ্রদ্ধাবোধের প্রতিফলন।

সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরাও বলছেন, একুশের আবহ শুরু হয় আসলে কয়েক দিন আগ থেকেই। শহীদ মিনারকে ঘিরে আলপনা আঁকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় একটি ঐতিহাসিক পরিবেশ, যা মানুষের মনে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। তাদের মতে, এই প্রস্তুতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জাতির আত্মপরিচয়ের শক্তি।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু মিনার প্রাঙ্গণ নয়, আশপাশের এলাকাও সাজানো হচ্ছে বিশেষভাবে। সড়কের বাতি মেরামত, পথ নির্দেশক চিহ্ন বসানো এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য অস্থায়ী ব্যারিকেড স্থাপন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে লক্ষ্য একটাই—শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্ত যেন হয় শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি দিন, যা কেবল অতীত স্মরণ নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দেয়। ভাষার মর্যাদা রক্ষার সেই সংগ্রাম আজ স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক শক্তির ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শহীদ মিনারকে ঘিরে এই প্রস্তুতি শুধু একটি জাতীয় অনুষ্ঠানকে সফল করার প্রয়াস নয়, বরং জাতির আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক গভীর প্রয়াস।

সব প্রস্তুতি শেষে যখন একুশের প্রথম প্রহরে মানুষ ফুল হাতে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যাবে, তখন এই শ্রম, পরিকল্পনা ও ভালোবাসার প্রতিটি স্পর্শ যেন দৃশ্যমান হবে। নীরব প্রভাতের আলোয় সাদা মিনারের সামনে লাল ফুলের স্তবক আর মানুষের শ্রদ্ধানত মাথা—এই দৃশ্যই প্রমাণ করবে, ভাষার জন্য দেওয়া আত্মত্যাগ কখনো বিস্মৃত হয় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত