জাতীয় পুরস্কারে স্বচ্ছতা চান শাকিব খান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
শাকিব খান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নিয়ে যখন নানা মহলে আলোচনা চলছে, তখন দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকেও উঠে আসছে সংস্কারের দাবি। ঢালিউডের শীর্ষ অভিনেতা শাকিব খান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, শিল্পের কাঠামোগত উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়ে তার সুস্পষ্ট মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও সৃজনশীল শক্তির প্রতিফলন। তাই এই শিল্পকে শক্তিশালী করতে হলে নীতি ও কাঠামোর সংস্কার জরুরি।

অভিনেতার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তিনি বলেছেন, পুরস্কার প্রদানের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক না হলে প্রকৃত মেধাবীরা উৎসাহ হারান। তার ভাষায়, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি বা অস্বচ্ছতা যদি কোনোভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে, তবে তা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে চলচ্চিত্রের মান কমিয়ে দেয়। তিনি মনে করেন, একটি স্বাধীন ও পেশাদার বিচারকমণ্ডলী গঠন করা প্রয়োজন, যারা নিরপেক্ষভাবে চলচ্চিত্র মূল্যায়ন করবেন এবং সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন।

তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন স্কোরিং পদ্ধতি চালু করা হলে বিচারকদের নম্বর প্রদানের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকবে এবং প্রয়োজনে তা যাচাই করা যাবে। একই সঙ্গে একটি বিস্তারিত পাবলিক রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে দর্শক ও নির্মাতাদের কাছে স্পষ্ট হবে কোন মানদণ্ডে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এতে বিতর্ক কমবে এবং পুরস্কারের মর্যাদা বাড়বে।

শাকিব খান শুধু পুরস্কার ব্যবস্থার সংস্কার নয়, চলচ্চিত্র শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক অঞ্চলে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়ায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এই সংকট কাটাতে সরকারিভাবে স্বল্পসুদে ঋণ, করছাড় এবং পুনর্গঠন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের মাধ্যমে দর্শকদের আবার হলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণে জমি লিজ সুবিধা, ভ্যাট ও ট্যাক্স ছাড় এবং প্রজেকশন ও সাউন্ড যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক কমানো হলে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন।

অভিনেতা মনে করেন, একটি প্রেক্ষাগৃহ শুধু সিনেমা দেখানোর জায়গা নয়; এটি হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেখানে চলচ্চিত্র উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজন করা গেলে নতুন প্রজন্ম শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। তার ভাষায়, “একটি প্রেক্ষাগৃহ যদি সারা বছর প্রাণবন্ত থাকে, তাহলে তা শুধু ব্যবসা নয়, সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশেও অবদান রাখবে।”

চলচ্চিত্র শিল্পের কর্মপরিবেশ নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, অনেক সময় শুটিং সেট বা প্রযোজনার পরিবেশে পেশাদারিত্বের অভাব দেখা যায়, যা শিল্পের মান ক্ষুণ্ন করে। তাই সরকারকে এমন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে যাতে নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি সুসংগঠিত শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশের চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং প্রেক্ষাগৃহ সংকট—সব মিলিয়ে শিল্পটি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে শীর্ষ তারকার এমন মন্তব্য শিল্পের ভেতরে সংস্কার আলোচনাকে আরও জোরালো করতে পারে। কারণ জনপ্রিয় শিল্পীরা যখন নীতিগত প্রশ্ন তোলেন, তখন তা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ এর চলচ্চিত্র ইতিহাসে জাতীয় পুরস্কার বরাবরই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। এই পুরস্কার অর্জন মানে শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, বরং একটি চলচ্চিত্র বা শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তাই এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায় এবং তা শিল্পীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে।

চলচ্চিত্র গবেষকদের অনেকে মনে করেন, পুরস্কার ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়ন চালু করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আধুনিক ও নির্ভুল হবে। পাশাপাশি বিচারকমণ্ডলীর নাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ফলাফলের বিশ্লেষণ প্রকাশ করলে দর্শক ও নির্মাতাদের আস্থা বাড়বে। শাকিব খানের প্রস্তাবগুলো এই আধুনিকায়ন ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন তারা।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা আরও বলেন, একটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্প কেবল বিনোদন শিল্প নয়; এটি অর্থনীতি, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। উন্নত প্রেক্ষাগৃহ, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত জনবল থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ এবং যৌথ প্রযোজনার সুযোগ বাড়ে। ফলে শিল্পের আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এই বাস্তবতায় চলচ্চিত্র অবকাঠামো উন্নয়নের প্রশ্নটি এখন কেবল শিল্পীদের নয়, জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।

শাকিব খান তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার যদি শিল্পখাতের বাস্তব সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, তবে চলচ্চিত্র শিল্প আবারও স্বর্ণযুগে ফিরতে পারে। তার মতে, নীতিগত স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং সৃজনশীল স্বাধীনতা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দেশের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, তার এই বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মত নয়, বরং শিল্পের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রত্যাশার প্রতিফলন। কারণ শিল্পীরা সবসময়ই চান তাদের কাজের মূল্যায়ন হোক নিরপেক্ষভাবে এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যেন প্রকৃত মেধার ভিত্তিতেই দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বচ্ছতা থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও কর্মপরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে শাকিব খান যে বার্তা দিয়েছেন, তা দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে তার এই স্পষ্ট অবস্থান অনেকের কাছেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারক মহল এই আহ্বানকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত