ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলও আসবে কঠোর নিয়ন্ত্রণে: শিক্ষামন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিয়ন্ত্রণ

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার ও আধুনিকায়নের স্পষ্ট বার্তা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি জানিয়েছেন, দেশে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে শিগগিরই সরকারি নিয়মনীতির আওতায় আনা হবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি শিক্ষা খাত নিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার, পরিকল্পনা ও সংস্কার উদ্যোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ সচিবালয় এ অনুষ্ঠিত ওই ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনতে হলে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সমান নীতিমালা প্রয়োগ জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর কার্যক্রম তুলনামূলক স্বাধীনভাবে পরিচালিত হলেও এখন সময় এসেছে সেগুলোকে একটি একীভূত নীতির আওতায় আনার। এতে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাবে।

মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চলবে না। বদলি বাণিজ্য বা প্রশাসনিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ধীরে ধীরে অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে, যাতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত ও নির্ভুল হয়। তিনি আশ্বাস দেন, শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা হবে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করবে।

শিক্ষামন্ত্রী অতীতের কিছু ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন, কখনো কখনো দেখা গেছে পরীক্ষা বন্ধ করা বা অটো পাস আদায়ের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার মান ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি আরও বলেন, কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের ক্লাস বা পরীক্ষা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন, তবে সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, এখানে রাজনৈতিক প্রভাব নয় বরং একাডেমিক শৃঙ্খলাই প্রধান হওয়া উচিত।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হলে পাঠ্যক্রম পুনর্বিবেচনা জরুরি। বর্তমান যুগের প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিকুলাম রিভিউ করা হবে বলে তিনি জানান। তার মতে, বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।

মন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে নকলবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনই পড়বে না। তিনি মনে করেন, পরীক্ষাব্যবস্থা যদি আধুনিক ও কঠোরভাবে পরিচালিত হয় এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যদি ডিজিটাল ও নিরপেক্ষ হয়, তবে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই সৎ পথে পরীক্ষা দিতে উৎসাহিত হবে।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ ভার্সন, ইংলিশ মিডিয়াম ও মাদ্রাসা—এই বিভিন্ন ধারার শিক্ষা কাঠামো একদিকে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে সমন্বয়ের অভাবও তৈরি করেছে। তারা মনে করেন, সরকার যদি সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি নীতিমালার আওতায় আনতে পারে, তবে শিক্ষার মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদারকি সীমিত থাকে। ফলে ফি নির্ধারণ, ভর্তি নীতি বা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনো কখনো অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই বাস্তবতায় সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে অভিভাবকদের আস্থা বাড়তে পারে।

মন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না এবং তিনি দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগতভাবে স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানান, অতীতেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি এবং বর্তমান দায়িত্বেও তিনি একই মানদণ্ড বজায় রাখতে চান।

তার বক্তব্যে নতুন সরকারের শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনার একটি বড় চিত্র ফুটে ওঠে। এতে বোঝা যায়, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করতে চায়। বিশেষ করে অ্যাপভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে শিক্ষকদের বদলি, শিক্ষার্থীদের ফলাফল, বই বিতরণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।

বাংলাদেশ এর শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারের আলোচনায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নীতিগত সমন্বয়—সব দিকেই পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য সেই আলোচনাকে নতুন করে জোরালো করেছে।

অভিভাবক মহলের একাংশ মনে করেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার মান ও খরচ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, নিয়ন্ত্রণের নামে যেন অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, নতুন মন্ত্রীর এই অবস্থান শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। তার ঘোষিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা একটি সমন্বিত ও আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ পেতে পারে। তবে বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর।

সব মিলিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর দৃঢ় বক্তব্য শিক্ষা খাতে সংস্কারের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলকে নিয়ন্ত্রণে আনা থেকে শুরু করে কারিকুলাম আধুনিকায়ন, দুর্নীতি রোধ এবং ডিজিটাল প্রশাসন চালুর মতো পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত