প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রমজান মাস এলেই বদলে যায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস। ভোররাতে সেহরি খাওয়া, সারাদিন দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং সন্ধ্যায় ইফতারে হঠাৎ ভারী খাবার গ্রহণ—এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়ে পরিপাকতন্ত্রে। ফলে অনেকেরই দেখা দেয় পেট ফাঁপা, বদহজম, গ্যাস, অম্বল কিংবা অ্যাসিডিটির মতো সমস্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, এগুলো অস্বাভাবিক নয়; বরং খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে শরীরের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হওয়াই এর প্রধান কারণ। তবে কিছু সচেতনতা ও সঠিক খাদ্য পরিকল্পনা অনুসরণ করলে এসব সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজার সময় শরীর দীর্ঘ সময় পানিশূন্য থাকে। তাই ইফতার ও সেহরির মাঝখানে পর্যাপ্ত পানি না খেলে হজমে সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। একবারে অনেক পানি পান না করে ধীরে ধীরে বিরতি দিয়ে পানি পান করলে শরীর তা সহজে গ্রহণ করতে পারে এবং পাকস্থলীতে চাপ পড়ে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করলে শুধু গ্যাস বা অম্বলই কমে না, বরং শরীরের বিপাকক্রিয়াও স্বাভাবিক থাকে এবং ক্লান্তি কম অনুভূত হয়।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতারে অনেকেই অতিরিক্ত তেলযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার খেয়ে ফেলেন, যা হজমের জন্য বড় চাপ তৈরি করে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ইফতার শুরু করা উচিত হালকা খাবার দিয়ে। খেজুর, ফল বা স্যুপ জাতীয় খাবার পাকস্থলীকে ধীরে ধীরে খাবার গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে। এরপর ধাপে ধাপে মূল খাবার খেলে হজমের সমস্যা কম হয়। হঠাৎ ভারী খাবার খেলে পাকস্থলী একসঙ্গে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে গ্যাস ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া বা খুব বেশি হাঁটাহাঁটি করা—দুটোই হজমের জন্য ক্ষতিকর বলে মত দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। খাওয়ার পর অন্তত আধা ঘণ্টা স্বাভাবিকভাবে বসে থাকা বা হালকা নড়াচড়া করা ভালো। এতে খাবার পাকস্থলীতে সঠিকভাবে ভাঙতে পারে এবং অ্যাসিডিটির ঝুঁকি কমে। অনেকে মনে করেন খাওয়ার পর দ্রুত হাঁটলে হজম ভালো হয়, কিন্তু চিকিৎসকদের মতে অতিরিক্ত হাঁটা বা শরীরচর্চা করলে হজম প্রক্রিয়ায় চাপ পড়ে এবং অস্বস্তি বাড়তে পারে।
খাবারের সঙ্গে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান যুক্ত করলে হজমশক্তি বাড়ে। যেমন শসা, পুদিনা পাতা ও লেবু পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে সহায়ক। এসব উপাদানে থাকা প্রাকৃতিক এনজাইম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাকস্থলীর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে। খাবার শেষে টক দই খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা, কারণ এতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং হজমশক্তি উন্নত করে। নিয়মিত দই খেলে গ্যাস ও পেট ফাঁপার প্রবণতা কমে।
ফলমূলের ভূমিকা নিয়েও চিকিৎসকদের জোরালো মতামত রয়েছে। পাকা কলা ও পেঁপে হজমের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে বিবেচিত। এসব ফলে থাকা আঁশ ও প্রাকৃতিক এনজাইম অন্ত্রের গতিশীলতা বাড়ায় এবং পেট ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে পেঁপেতে থাকা পাপেইন নামের এনজাইম খাবার ভাঙতে সহায়তা করে, যা বদহজম কমাতে কার্যকর।
প্রচলিত ঘরোয়া পানীয়ও রোজার সময় উপকারী হতে পারে। জিরা ভেজানো পানি বা ডাবের পানি পেট ফাঁপা ও অম্বল কমাতে সহায়ক বলে চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেন। হঠাৎ গ্যাসের সমস্যা দেখা দিলে অল্প পরিমাণ আদা, তুলসি বা পুদিনা পাতা চিবিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। এসব প্রাকৃতিক উপাদান পাচনতন্ত্রকে শান্ত করে এবং গ্যাস জমা কমাতে সাহায্য করে।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু খাবার নয়, খাবারের সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ। সেহরিতে অতিরিক্ত ভারী বা মশলাদার খাবার খেলে সারাদিন অস্বস্তি থাকতে পারে। তাই সেহরিতে এমন খাবার বেছে নেওয়া উচিত যা সহজে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। যেমন ভাত, ডাল, সবজি, ডিম, দুধ বা ওটসের মতো খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয় এবং পাকস্থলীতে চাপ কম ফেলে।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মানসিক চাপও হজম সমস্যার একটি বড় কারণ। রোজার সময় অনেকেই কাজের চাপ বা ঘুমের ঘাটতির কারণে স্ট্রেসে থাকেন, যা পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত বিশ্রাম এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখাও সমান জরুরি। রোজা শুধু খাদ্য নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং জীবনযাত্রার ভারসাম্য রক্ষারও একটি সময়—এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রুটিন সাজালে শারীরিক সমস্যাও কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি নিয়ম মেনে চলার পরও কারও দীর্ঘদিন পেটের সমস্যা থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কখনও কখনও গ্যাস্ট্রিক আলসার, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা অন্ত্রের অন্যান্য রোগের লক্ষণও রোজার সময় বেশি অনুভূত হতে পারে। তাই সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
রমজান মাস আত্মশুদ্ধি ও সংযমের প্রতীক। এই সংযম যদি খাদ্যাভ্যাসেও বজায় রাখা যায়, তাহলে শুধু পেটের সমস্যা নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যই ভালো রাখা সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। সঠিক খাদ্য নির্বাচন, পর্যাপ্ত পানি পান, পরিমিত খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করলে রোজার পুরো মাসটি কাটানো যায় স্বস্তিতে ও সুস্থতায়।