ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ বিএনপির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৯ বার
বিএনপি ইশতেহার বাস্তবায়ন কর্মসূচি

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রম। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই দিনের মাথায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রশাসনের এ তৎপরতা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্রুততার নজির স্থাপন করছে।

সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমান আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন। এসব বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণ। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহায়তায় প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী এবং সদস্য হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিরা যুক্ত হয়েছেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ, কার্ডের নকশা প্রণয়ন এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল কাঠামো তৈরির দায়িত্ব এই কমিটিকে দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেজ এবং জাতীয় গৃহস্থালি তথ্যভান্ডারের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের সুপারিশ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সরকার চায় আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই অন্তত প্রথম ধাপের কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করতে, এজন্য কমিটিকে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, দেশের প্রায় চার কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে ধাপে ধাপে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে এবং কার্ডটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে। সরকারের মতে, এটি কেবল আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নয়; বরং নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ।

এই কর্মসূচির সঙ্গে অতীতের সামাজিক উন্নয়ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতাও তুলে ধরা হচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আর বর্তমান সরকার সেই ধারাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করতে চায়। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের যৌথ তত্ত্বাবধান থাকবে এবং অভিযোগ তদন্তের আলাদা ব্যবস্থাও রাখা হবে।

একই দিনে অনুষ্ঠিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বৃক্ষরোপণ ও জলসম্পদ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের জানান, সরকারের লক্ষ্য পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো। তিনি বলেন, চারা সংগ্রহের জন্য সরকারি নার্সারির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও সম্পৃক্ত করা হবে। নদীর চর, বাঁধ, সড়কের ধারে, পার্বত্য এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চল—বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন লবণাক্ত পরিবেশে—উপযোগী প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদিও চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে, তবে আগামী বছর অতিরিক্ত রোপণের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

জলাধার, নদী ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা কমানো, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে তাদের নিজ নিজ খাতে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক সভায় নবনিযুক্ত মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, জনগণ তাদের ওপর যে আস্থা রেখেছে, তার প্রতিদান দিতে সরকার দ্রুত কাজ শুরু করেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান ফলাফল দেখাতে চায়। তাঁর বক্তব্যে সরকারের অভ্যন্তরে কর্মচাঞ্চল্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও সরকারের এই তৎপরতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়–এর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম বলেন, নতুন সরকারের উদ্যোগ প্রমাণ করে তারা নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিক। তাঁর মতে, সাধারণত সরকারগুলো দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিকল্পনা প্রণয়নে সময় নেয়, কিন্তু এখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর কলা অনুষদের ডিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান মন্তব্য করেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচায়ক। তিনি মনে করেন, এসব উদ্যোগ যদি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জীবনমান পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা যেমন উচ্চ, তেমনি সংশয়ও কম নয়। ফলে শুরুতেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সরকার যে বার্তা দিতে চাচ্ছে, তা হলো—তাদের অঙ্গীকার কেবল নির্বাচনি ভাষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সামাজিক নীতিনির্ধারকদের মতে, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও জলাধার পুনঃখনন কর্মসূচি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর তদারকির ওপর।

সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সমর্থকরা এটিকে পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন, আর সমালোচকরা নজর রাখছেন বাস্তবায়নের গতির ওপর। সময়ই বলে দেবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবে রূপ নেয়। তবে আপাতত রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বার্তাটি স্পষ্ট, তা হলো—নতুন প্রশাসন শুরুতেই কর্মতৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের অঙ্গীকারের প্রতি দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত দিতে চাইছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত