প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে নানা আলোচনায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটির সক্রিয়তা, আন্তর্জাতিক মহলের মন্তব্য এবং কূটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনা নতুন করে বিতর্ক ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের কূটনৈতিক ও গণমাধ্যম মহলে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ ঘন ঘন উঠে আসায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়ে উঠেছে।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন সম্প্রতি দেশটির সংবাদ সংস্থা এএনআই–এর বরাতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বলেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন সরকার হয়তো আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার বিষয়টি ভাবতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে তাৎক্ষণিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মতামত হলেও তা কূটনৈতিক মনোভাবের ইঙ্গিত হিসেবেও বিবেচিত হয়, ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর আন্তর্জাতিক দৃষ্টি কতটা নিবদ্ধ আছে তা স্পষ্ট হয়।
বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দেশের আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল–এ আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা হবে দেশের জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে নতুন প্রশাসন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে চায়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরা ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য, বিচারাধীন রাজনৈতিক মামলার অগ্রগতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–র ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিএনপির নীতিনির্ধারক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জবাবে বলেন, বিচারিক বিষয় আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং সরকার বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর বক্তব্যে সরকার প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতার পৃথকীকরণে অঙ্গীকারবদ্ধ বলেই প্রতীয়মান হয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, তিনি নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন, তবে রাজনৈতিক সংলাপের পথ খোলা রাখার পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিডিও কনফারেন্সে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দেশের বড় রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে এবং নির্বাচন এমনভাবে আয়োজন করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলক বেশি প্রভাব পেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্থায়ী নয় এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনোত্তর সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোথাও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে, কোথাও আবার স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের কার্যক্রম চালুর ঘোষণা এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমান–এর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে সম্প্রতি কয়েকজন ব্যক্তি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে জনতার প্রতিক্রিয়ার মুখে পুলিশ তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো গ্রেপ্তার ছিল না; বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নেওয়া পদক্ষেপ।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে দলটির বিরুদ্ধে চলমান মামলা ও বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি রায়ে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও চলছে। এসব মামলার অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—দুটি বিষয়ই এখন দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; বরং আইনি প্রক্রিয়া, জনমত এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব এতে ভূমিকা রাখে। তাঁদের ভাষ্য, বাংলাদেশের মতো বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো দলকে স্থায়ীভাবে রাজনীতির বাইরে রাখা কঠিন, তবে সেটি নির্ভর করে আইনি অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ মনে করেন, ভারতের কূটনৈতিক বা গণমাধ্যম মহলে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ উঠে আসা স্বাভাবিক, কারণ দুই দেশের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বাইরের মন্তব্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইনগত প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
রাজনৈতিক অঙ্গনের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের রাজনীতি স্থির হয়নি; বরং নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাসীনদের প্রশাসনিক কর্মকৌশল, অন্যদিকে বিরোধী শক্তির পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা—এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় দেশ একটি পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পর্যায়ে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা নির্ভর করবে আইনি সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংলাপ এবং জনমতের গতিপ্রকৃতির ওপর।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সমর্থকরা এটিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, সমালোচকেরা আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে সামনে আনছেন। ফলে বিষয়টি শুধু দলীয় রাজনীতির সীমায় আটকে নেই; বরং রাষ্ট্রীয় নীতি, বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে।