বড় ঋণে বাড়ছে খেলাপি, ছোট উদ্যোক্তারা এগিয়ে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৮ বার
বড় ঋণে বাড়ছে খেলাপি, ছোট উদ্যোক্তারা এগিয়ে

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণের কাঠামো ও খেলাপির চিত্র নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক–এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—ঋণের পরিমাণ যত বড়, খেলাপির ঝুঁকিও তত বেশি। বিপরীতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নিয়েও তা পরিশোধে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছেন। এই বৈপরীত্য দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, নৈতিকতা এবং অর্থনীতির কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ ঋণই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে গেলেও বড় ঋণগুলোর মধ্যেই খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপির হার ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এই দুই শ্রেণির ঋণ মিলিয়ে দেখা যায়, ছোট ও মাঝারি ঋণে গড় খেলাপির হার প্রায় ২১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা বড় ঋণের তুলনায় অনেক কম।

অন্যদিকে, বড় ঋণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ৪৮ শতাংশ। ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে এই হার ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ। ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে তা ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে, যেখানে খেলাপির হার ৫১ শতাংশ। এই শ্রেণির ঋণের পরিমাণই ছিল সর্বোচ্চ, প্রায় ৫ লাখ ৩১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, এই তথ্য দেশের অর্থনীতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ছোট উদ্যোক্তারা সাধারণত তাদের ব্যবসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকেন। ফলে ঋণ পরিশোধ না করলে তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। এ কারণে তারা উচ্চ সুদের ঋণ নিয়েও তা সময়মতো পরিশোধের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে বড় গ্রাহকদের অনেকেই ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন, যার কারণে তারা ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করেন বা নানা ধরনের সুবিধা নিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক এবং ট্রাস্ট ব্যাংক–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, বড় গ্রাহকদের অনেকেরই বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ ও প্রভাব থাকে। ফলে তারা মনে করেন, ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধ না করলেও চলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে এবং দ্রুত সমাধান না হলে দেশের আর্থিক খাত আরও বড় সংকটে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, ছোট উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। তারা শুধু ঋণ পরিশোধেই দায়িত্বশীল নন, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

একই ধরনের অভিমত প্রকাশ করেছেন ব্র্যাক ব্যাংক–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান। তিনি বলেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মূলত ব্যবসার মাধ্যমেই টিকে থাকেন। তাই তারা ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তিনি জানান, এই শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালু করার ফলে তাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের কিছু ব্যাংক খেলাপি ঋণের কারণে ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকের খেলাপির হার ৯০ শতাংশেরও বেশি, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এসব ঋণের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক–সহ কয়েকটি ব্যাংক একত্রিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নজরদারি এবং কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় ঋণে খেলাপির উচ্চ হার দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ এই ঋণগুলো সাধারণ মানুষের আমানত থেকে দেওয়া হয়। ফলে বড় ঋণ খেলাপি হলে এর প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর।

এছাড়া বড় ঋণ খেলাপির সঙ্গে অর্থ পাচারের অভিযোগও যুক্ত রয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ইতিবাচক ভূমিকা দেশের অর্থনীতির জন্য আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা শুধু ঋণ পরিশোধেই দায়িত্বশীল নন, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে বড় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই–বাছাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রতিবেদন দেশের ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে ব্যাংকিং খাত আবারও আস্থার জায়গায় ফিরে আসতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত