প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার— এমন বার্তাই মিলছে সাম্প্রতিক নীতিগত উদ্যোগ ও প্রশাসনিক তৎপরতা থেকে। আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, মাদক শুধু ব্যক্তির জীবন নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পর্যায়ে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাকে অনেকেই যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান ও প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
নীতিনির্ধারণী মহল বলছে, সরকারি চাকরি, বেসরকারি নিয়োগ, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বা নবায়ন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি এবং বিশেষ কিছু লাইসেন্স গ্রহণের ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জৈব নমুনার মাধ্যমে মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ সংক্রান্ত বিধিমালার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় কেউ মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত হলে নির্ধারিত চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিধিমালা কার্যকর হলে মাদকের চাহিদা কমবে এবং সরবরাহ চক্র দুর্বল হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানে সমন্বয় জোরদার করতে সক্রিয় হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সংস্থাটি দেশজুড়ে মাদক রুট, কারবারি নেটওয়ার্ক, আসক্তের সংখ্যা এবং মামলার পরিসংখ্যান হালনাগাদ করছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করলে বড় চক্র ভাঙা সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক ভাষণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরে এক বিবৃতিতে দলের নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। যদিও সরকারিভাবে এসব বক্তব্যের প্রশাসনিক অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবু সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে— মাদকবিরোধী কঠোর নীতির পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে।
মাদকবিরোধী সংগঠন মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে। তার মতে, সমস্যার সমাধানে সরবরাহ বন্ধ, চাহিদা কমানো এবং ক্ষতি হ্রাস— এই তিনটি দিক একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, হঠাৎ ডোপ টেস্ট চালু করা হলে অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হতে পারে, কারণ পূর্বঘোষণা থাকলে আসক্ত ব্যক্তি সাময়িকভাবে মাদক গ্রহণ বন্ধ রেখে পরীক্ষায় ধরা পড়া এড়াতে পারে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে চালকদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষা দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মত দেন।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সহযোগী অধ্যাপক, মনে করেন যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। তার মতে, ভর্তি প্রক্রিয়ায় ডোপ টেস্ট অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা প্রতিরোধমূলক বার্তা দেবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো পরীক্ষা বা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত হচ্ছে এবং তা হাতে পেলেই সংস্থাটি নিজস্ব কৌশল চূড়ান্ত করবে। তিনি জানান, বর্তমানে অভিযান কার্যক্রম জোরদার রয়েছে এবং নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী তা আরও সম্প্রসারিত হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডোপ টেস্ট বিধিমালা কার্যকর হলে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
সামাজিক গবেষকেরা মনে করেন, মাদক শুধু অপরাধের কারণ নয়, বরং অপরাধের পেছনের অন্যতম চালিকাশক্তি। ছিনতাই, চুরি, সহিংসতা কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের মতো বহু ঘটনায় মাদকাসক্তির প্রভাব পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ আছে। তাই প্রতিরোধমূলক নীতি হিসেবে ডোপ টেস্ট চালু করা হলে অপরাধ প্রবণতা কমতে পারে। একই সঙ্গে পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা না গেলে কেবল আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় বলেও তারা মনে করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নও বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাধ্যতামূলক পরীক্ষার পাশাপাশি কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে ফলাফল বেশি ইতিবাচক হয়। এ কারণে তারা সমন্বিত নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সচেতন নাগরিক সমাজ বলছে, মাদকবিরোধী লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠলে আইন প্রয়োগের চাপ কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তারা মনে করেন, ডোপ টেস্ট নীতি যদি বৈজ্ঞানিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে তা প্রতিরোধমূলক সামাজিক বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। কারণ অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই আইন থাকলেও প্রয়োগের ঘাটতি দেখা গেছে। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতি প্রণয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। অন্যথায় কঠোর ঘোষণা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
মোটের ওপর পরিস্থিতি বলছে, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে নতুন করে গতি সঞ্চারের চেষ্টা চলছে। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও একই সঙ্গে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। তবে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা একমত— সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে মাদকের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।