প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সূচনায় এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে, তাই এই নির্বাচনের আয়োজনকে সামনে রেখে কমিশন ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে কমিশনকে প্রেরিত চিঠিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে, যা নতুন সরকার গঠনের মাত্র তিন দিনের মধ্যে করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২ জুনে, তাই এ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ১ জুনে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রথম সভা হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ জুনে, ফলে এর মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুনে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ফলে এ সিটির মেয়াদ আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে। আইন অনুযায়ী এই মেয়াদোত্তীর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোতে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন নিশ্চিত করা জরুরি।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে চিঠি পাওয়ার পরই কমিশনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী সপ্তাহের মধ্যে কমিশনের বৈঠকে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করব। অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করা হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেমন আমরা প্রভাবমুক্ত নির্বাচন সম্পন্ন করেছি, ভবিষ্যতেও সেসবের নিরপেক্ষতার প্রমাণ আমরা রাখব।’
কমিশনের এই উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের মেয়র, কাউন্সিল, চেয়ারম্যানদের পদত্যাগের ফলে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৩৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের প্রতিনিধিদের অপসারণ করে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া বাকি সব প্রতিষ্ঠান প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মেয়াদোত্তীর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচনের আয়োজন দেশের স্থানীয় সরকারের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পুনঃস্থাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল জামায়াতসহ তাদের মিত্ররা, কিন্তু বিএনপি ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে নির্বাচনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল। এবার নতুন সরকার গঠনের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি আবারো ত্বরান্বিত হয়েছে।
ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজনকে ঘিরে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে যে নির্বাচনের সকল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, বুথের স্থান নির্ধারণ, কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তুতি দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কমিটি ও কর্মকর্তা পর্যায় থেকে শুরু করে ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে কমিশন বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচনের আয়োজনের মাধ্যমে দেশের স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কমিশনের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোটের সময় কোনো ধরনের প্রভাব বা অনিয়ম প্রতিরোধ করা এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
নতুন সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন দেশের স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনঃস্থাপন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নাগরিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে ধরা হচ্ছে। কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ ও আয়োজনের ক্ষেত্রে সকল ধাপ আইন এবং নির্বাচনী নীতিমালা অনুযায়ী কার্যকর হবে।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তিনটি এলাকায় ভোটার, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনকে নিয়ে সুসংহত ও স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য কমিশন ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের সময় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হবে।