প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহীদদের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রাক্কালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং সারাদেশের শহীদ বেদীগুলোকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাহিনীর মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেন, ভাষা শহীদদের স্মরণে জাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি নির্বিঘ্ন ও মর্যাদাপূর্ণভাবে পালন নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রশিক্ষিত সদস্যদের।
শহীদ মিনার এলাকা ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভেতরের ও বাইরের পরিধি নির্ধারণ করে সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রবেশপথে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। গোটা এলাকাকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করে প্রতিটি সেক্টরে আলাদা দায়িত্বশীল ইউনিট নিয়োজিত করা হয়েছে, যারা ফুট পেট্রোল, যানবাহন টহল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত স্ট্রাইকিং টিম নিয়ে সার্বক্ষণিক কাজ করবে।
নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, ডগ স্কোয়াড এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। শহীদ মিনার এলাকায় তিন শতাধিক সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন এবং পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থার ফলে ভিড়ের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
কর্তৃপক্ষের মতে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের প্রতীক এবং ভাষার অধিকারের জন্য আত্মত্যাগের অনন্য স্মারক। তাই এই দিনকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লাখো মানুষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। বিপুল জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সমন্বিত পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা।
মহাপরিচালক আরও বলেন, অতীতে অস্থির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে বাহিনীসমূহ সফল হয়েছে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতেও অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে দাবি আদায় বা আন্দোলনের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কিংবা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন দায়িত্ব, তেমনি জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অঙ্গীকার।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকির তথ্য নেই, তবে সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় যেখানে যেখানে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে, সেসব স্থানেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলোও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের জাতীয় দিবসগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; এটি জনমনে আস্থা সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী বড় জনসমাগমে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত বাহিনী মোতায়েন আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পিত প্রস্তুতি জননিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যেও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে স্বাগত জানানোর প্রবণতা দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, কঠোর নিরাপত্তা থাকলে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষজন স্বস্তি বোধ করেন। একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, শৃঙ্খলা বজায় রেখে সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন, তবে জাতীয় এই শোক ও গৌরবের দিনটি আরও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী ভাষার অধিকার রক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই দিবসের তাৎপর্য ব্যাপক। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ও শহীদ বেদীগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি রক্ষার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যে বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বাহিনীগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতি—সবকিছু মিলিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা নিবেদনের এই মহেন্দ্রক্ষণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পালিত হবে বলেই প্রত্যাশা সবার।