প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংকটের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা এক নতুন অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সর্বসম্মতিক্রমে একটি বহুল আলোচিত ‘সাধারণ ক্ষমা আইন’ পাস করেছে, যা ইতিমধ্যেই দেশটির রাজনীতি ও সমাজে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই আইনের ফলে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আটক শত শত রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বহু পরিবারের কাছে নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ক্ষমা আইনের অনুমোদনকে অনেক বিশ্লেষক ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড় বলে মনে করছেন। আইনটি পাস হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ রাজধানী কারাকাস-এর ঐতিহাসিক মিরাফ্লোরেস প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষরের পর তিনি এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, একটি জাতি যদি সামনে এগোতে চায়, তবে তাকে অতীতের দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং ক্ষমা করা ও ক্ষমা গ্রহণ—উভয়ই শিখতে হবে। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে এবং অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তবে আইনটি যতটা আশার সঞ্চার করেছে, ততটাই বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। বিল অনুযায়ী, যারা রাষ্ট্রবিরোধী সামরিক তৎপরতায় উসকানি দেওয়া বা সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত কিংবা দণ্ডিত, তারা এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় পড়বেন না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থেই এই সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। সমালোচকরা যদিও বলছেন, এই ব্যতিক্রমী ধারা ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হতে পারে এবং কারা প্রকৃতপক্ষে ‘সামরিক ষড়যন্ত্রকারী’—তা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এই আইন পাসের পেছনে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার কাঠামোয় নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তার পরপরই ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটনের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই ক্ষমা আইনটি দ্রুত পাস হয়েছে।
আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়সীমা। ১৯৯৯ সাল থেকে সংঘটিত রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর ওপর এটি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আন্দোলন, অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং সহিংসতার নানা অধ্যায় এই আইনের আওতায় আসবে। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ-এর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টা, ২০০২ সালের ঐতিহাসিক তেল ধর্মঘট এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা। বিশ্লেষকদের মতে, এত দীর্ঘ সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করা আইনটিকে কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
গত কয়েক বছরে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করেছে। কারাবন্দিদের পরিবারের সদস্যরা বহুবার অভিযোগ করেছেন যে তাদের স্বজনরা কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাননি। মানবাধিকার সংগঠন ফোরো পেনাল জানিয়েছে, মাদুরোর পতনের পর প্রায় ৪৫০ বন্দি মুক্তি পেলেও এখনও ছয় শতাধিক মানুষ কারাগারে রয়েছেন। সংস্থাটির পরিচালক গনজালো হিমিয়ব বলেছেন, জাতীয় সমঝোতার বাস্তব পরীক্ষা এখন শুরু হলো, কারণ আইন পাস করা যত সহজ, বাস্তবে তা ন্যায়সংগতভাবে প্রয়োগ করা তত কঠিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমা আইনটি দেশের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দল, মানবাধিকার কর্মী এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। এই দাবির সঙ্গে যুক্ত ছিল পরিবারের সদস্যদের মানবিক আর্তি। কারাগারের বাইরে টানা অবস্থান, অনশন কর্মসূচি এবং প্রতিবাদ সমাবেশ ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। আইনটি পাস হওয়ায় এসব পরিবারের মধ্যে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা নতুন করে জেগেছে।
তবে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, আইনটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাদের মতে, ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন কাঠামো তৈরি করছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, যদি মুক্তি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হয়, তবে এই আইন উল্টো নতুন অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ঘটনাটিকে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষার সূচনা হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ দেশটিকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ক্ষমা আইনটি কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা, যা দেশটির নতুন প্রশাসনের অগ্রাধিকার ও কৌশলকে তুলে ধরে।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আইনটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা জাতীয় সংলাপের পথ খুলে দিতে পারে। এতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে ব্যর্থ হলে এর ফল উল্টো হতে পারে এবং নতুন করে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হতে পারে।
এখন দৃষ্টি সবার এক জায়গায়—এই আইনের বাস্তব প্রয়োগ। বন্দিদের তালিকা চূড়ান্ত করা, কারা মুক্তি পাবে তা নির্ধারণ করা এবং মুক্তির পর তাদের পুনর্বাসন—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ক্ষমা আইনটি ইতিহাসে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্মরণীয় হবে নাকি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সমালোচিত হবে।
ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি আরও সরল। তাদের কাছে এই আইন মানে কারাগারের অন্ধকার থেকে প্রিয়জনের ফিরে আসার সম্ভাবনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিলতা তাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো বহুদিনের অপেক্ষার অবসান হবে কি না। সেই উত্তরই আগামী দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে।