রমজানে সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ ৬ ঘণ্টা, নতুন নির্দেশনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
রমজানে সিএনজি স্টেশন সময়সূচি

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমন্বয়মূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গ্যাস সরবরাহে চাপ কমানো এবং বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে সারা দেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখার নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রমজানের প্রথম দিন থেকে আগামী ১৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মোট ছয় ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকবে, যা পূর্বের সময়সূচির তুলনায় তিন ঘণ্টা বেশি।

এই সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কে স্বল্পচাপ পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে ইফতার ও সেহরির সময় গৃহস্থালি গ্যাসের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এ সময় রান্নার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োজন হয়, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবহন খাতে সিএনজি ব্যবহার অব্যাহত থাকলে পাইপলাইনে চাপ কমে যায়। তাই গৃহস্থালির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে এই সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে।

এর আগে সিএনজি স্টেশনগুলো সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকত। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিকেল থেকেই স্টেশন বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নগর এলাকায় যেসব গণপরিবহন সিএনজি চালিত, সেগুলোর চালকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক চালক মনে করছেন, বিকেলবেলা স্টেশন বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হতে পারে এবং আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সাময়িক অসুবিধা সহ্য করলে সামগ্রিকভাবে জনগণের সুবিধাই বেশি হবে, কারণ রমজানে রান্নার গ্যাসের সংকট তৈরি হলে তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বেশি বিপর্যস্ত করবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল থাকলেও চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও গৃহস্থালি—সব খাতেই গ্যাসের ব্যবহার বাড়ায় বিতরণ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকাল শেষে গ্রীষ্মের শুরুতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে শুরু করলে বিদ্যুৎকেন্দ্রেও গ্যাসের প্রয়োজন বাড়ে। তার ওপর রমজানের সময় গৃহস্থালির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় চাপ আরও তীব্র হয়। এই প্রেক্ষাপটে সিএনজি স্টেশন আংশিক বন্ধ রাখার নীতি কয়েক বছর ধরেই প্রয়োগ করা হচ্ছে, তবে এবার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে পরিস্থিতি বিবেচনায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১৫ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সিএনজি ও ফিলিং স্টেশনগুলো সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে হবে। সরকারের ধারণা, ঈদের আগে ও পরে মানুষ গ্রামে যাতায়াত করে এবং তখন পরিবহন চাহিদা বেড়ে যায়। সেই সময় যদি জ্বালানি সরবরাহে বাধা থাকে, তবে যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগ বাড়বে এবং সড়কপথে যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। তাই ঈদের সময়টিকে বিবেচনায় রেখে সাময়িকভাবে স্টেশন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এরপর ২৬ মার্চ থেকে আবার আগের নিয়মে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত স্টেশন বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ বর্তমান ছয় ঘণ্টার বিধিনিষেধটি শুধুমাত্র রমজানের প্রথম অংশ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতে সময়সূচি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; এটি একটি ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস। একদিকে পরিবহন খাত সচল রাখা, অন্যদিকে গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানো—এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য। সরকারের জ্বালানি বিভাগ মনে করছে, সিএনজি স্টেশন আংশিক বন্ধ রাখলে পাইপলাইনে চাপ স্থিতিশীল থাকবে এবং বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যেসব এলাকায় চাপ কমে যায়, সেখানে এই সিদ্ধান্ত দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে পরিবহন খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের সময় মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। তাদের মতে, অনেক চালক প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত স্টেশন বন্ধ থাকলে তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারলে যাত্রী পরিবহন কমে যেতে পারে। তারা চাইছেন, প্রয়োজনে বিকল্প সময় নির্ধারণ বা বিশেষ কিছু স্টেশন খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে জরুরি যানবাহন বা দীর্ঘপথের গাড়ি সমস্যায় না পড়ে।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে রান্নার সময় গ্যাসের চাপ কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। তাই তাদের মতে, গৃহস্থালির গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তারা মনে করেন, সিএনজি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যদি সত্যিই চাপ কমাতে কার্যকর হয়, তবে তা জনস্বার্থে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

জ্বালানি খাত বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের মৌসুমি ব্যবস্থা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিতরণ লাইনের আধুনিকায়ন এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের প্রসার—এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট বারবার দেখা দিতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে চাপ সামাল দিতে প্রশাসনিক সময়সূচি পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কিছু অসুবিধা তৈরি করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্দেশনাটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে এর ফলাফল কী দাঁড়ায়। রমজানের প্রথম সপ্তাহেই বোঝা যাবে নতুন সময়সূচি গ্যাসচাপ পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক রাখতে পারে।

জনগণের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের ফলে ইফতার ও সেহরির সময় গ্যাস সংকটে পড়তে হবে না এবং রান্নাবান্না নির্বিঘ্নে করা যাবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতও যেন অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এমন ভারসাম্য রক্ষাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত