রাষ্ট্রদ্রোহে দণ্ডিত ইউন সুক ইয়োলের ক্ষমা প্রার্থনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
ইউন সুক ইয়োল

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ইউন সুক ইয়োল। একসময় ক্ষমতাধর এই নেতা, যিনি কয়েক বছর আগেও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, এখন কারাগারের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি স্বীকার করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার আদালতের রায় ঘোষণার পর শুক্রবার আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং নিজের পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট ভোগান্তির দায় স্বীকার করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক যুগান্তকারী বলে মনে করছেন। কারণ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টকে রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া বিরল ঘটনা। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পার্লামেন্ট অচল করার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার দায় প্রমাণিত হয়েছে। সেই সময় তার ঘোষিত সামরিক আইন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবং জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।

এই মামলার রায় দিয়েছে সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট। আদালতের বিচারক জি গুই-ইয়ন রায় ঘোষণার সময় বলেন, অভিযুক্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কণ্ঠরোধ করতে সেনাবাহিনীকে আইনসভা ভবনে পাঠিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য সংসদ কার্যত অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আদালতের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। বিচারক আরও বলেন, একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার কাছ থেকে গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি আনুগত্য প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু তিনি সেই আস্থা ভঙ্গ করেছেন।

২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে টেলিভিশনে আকস্মিক ভাষণে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন ইউন। ভাষণে তিনি দাবি করেছিলেন, দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে এবং তথাকথিত রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলছে। তিনি বিশেষভাবে উত্তর কোরিয়া–র প্রভাবের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে তার এই ঘোষণার পরপরই দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিরোধী দলসহ নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যেই আইনপ্রণেতারা জরুরি অধিবেশন ডেকে ভোটের মাধ্যমে সামরিক আইন বাতিল করেন, যা কার্যত তার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়।

রায়ের একদিন পর দেওয়া বিবৃতিতে ইউন বলেন, দেশকে রক্ষার সংকল্প থেকেই তিনি সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন, কিন্তু তার অদূরদর্শিতা জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে এবং সেই দায় এড়ানো যায় না। তার ভাষায়, দেশের স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে যদি জনগণের কষ্টের কারণ হয়ে থাকি, তবে তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন, কারণ এটি প্রথমবারের মতো তার পক্ষ থেকে সরাসরি দায় স্বীকারের ইঙ্গিত বহন করছে।

৬৫ বছর বয়সী এই সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অচল করতে চেয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা করেছিলেন। আদালত এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করে। তবে ইউন জানিয়েছেন, তিনি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি যে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন কি না। তার আইনজীবীরা বলছেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার আইনে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সাধারণত ২০ বছর কারাভোগের পর প্যারোলের আবেদন করতে পারেন। সে হিসেবে ইউন কখন মুক্তি পেতে পারেন, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার ভাগ্য নির্ধারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়া–র রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি গণতন্ত্রের শক্ত অবস্থানকে প্রমাণ করে, কারণ আইন সবার জন্য সমান—পদমর্যাদা যাই হোক না কেন। অন্যদিকে তার সমর্থকদের একটি অংশ বলছে, সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে এবং তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তবে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে মতামত বিভক্ত হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই মামলার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। তাদের মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার করলে রাষ্ট্রপ্রধানও আইনের ঊর্ধ্বে নন—এই বার্তাটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে অনেক দেশে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি সীমিত, সেখানে এই রায় গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের একটি শক্ত উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউনের ক্ষমা প্রার্থনার ভাষা ছিল সংযত ও অনুতপ্ত ভঙ্গির, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে তার ভাবমূর্তি আংশিক পুনর্গঠনের চেষ্টা হতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, এটি কেবল আইনি ও রাজনৈতিক চাপের ফল, প্রকৃত অনুশোচনা নয়। তবে যে কারণেই হোক, তার এই বক্তব্য দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি ব্যক্তির পতনের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনআস্থার জটিল সম্পর্কের প্রতিফলন। একজন নেতা যখন ক্ষমতার শীর্ষে থাকেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব কোটি মানুষের জীবনে পড়ে। সেই সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার প্রতিক্রিয়াও হয় ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী। ইউন সুক ইয়োলের ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ, যা ভবিষ্যতের নেতাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার চূড়ান্ত প্রভাব বোঝা যাবে সময়ের সঙ্গে। যদি আপিল প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে আইনি লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে এবং রাজনৈতিক উত্তাপও বজায় থাকতে পারে। তবে আপাতত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে এই রায় ও ক্ষমা প্রার্থনা এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে—যেখানে ক্ষমতা, দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতার প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত