শুরু হচ্ছে একুশে বইমেলা, শেষ প্রস্তুতির ব্যস্ততা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ প্রস্তুতি

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর শেষ হতে চলেছে। বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের অন্যতম মহোৎসব অমর একুশে বইমেলা শুরু হচ্ছে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনী পরিস্থিতির কারণে প্রায় এক মাস পিছিয়ে শুরু হলেও আয়োজকদের ব্যস্ততায় তার কোনো ছাপ নেই। রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত এখন কেবল প্রস্তুতির শব্দ। কাঠের ফ্রেমে হাতুড়ির ঠকঠক, রঙের তুলি, ব্যানার ঝোলানোর তাড়াহুড়া আর স্টল সাজানোর কর্মযজ্ঞ—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন এক বিশাল কর্মশালায় রূপ নিয়েছে।

মেলা শুরুর আগে এমন ব্যস্ততা নতুন কিছু নয়, তবে এবারের আবহে রয়েছে ভিন্ন মাত্রা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনের কারণে নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে যাওয়ায় আয়োজক, প্রকাশক ও লেখকদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব জটিলতা কাটিয়ে আয়োজন নিশ্চিত হওয়ায় এখন সবার মুখে স্বস্তির হাসি। স্টল ফি মওকুফের ঘোষণাও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। প্রকাশকদের অনেকেই জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপের সময় এই সিদ্ধান্ত তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে।

মেলার প্রস্তুতিতে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন নির্মাণকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা। দিনরাত কাজ করে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব অবকাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। কেউ স্টলের কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ রঙ করছেন, কেউ আবার বিদ্যুৎ সংযোগ ও আলোকসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত। প্রতিটি স্টল যেন একটি ছোট্ট সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী—কোথাও ঐতিহ্যবাহী নকশা, কোথাও আধুনিক ডিজাইন, আবার কোথাও সাহিত্যিকদের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হচ্ছে দেয়াল। আয়োজকরা বলছেন, এবারের মেলার নকশা ও বিন্যাস এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে দর্শনার্থীরা সহজে চলাচল করতে পারেন এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকে।

মেলার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বরাবরের মতোই গুরুত্ব পাচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানের আবেগ বইমেলাকে অন্য মাত্রা দেয়। ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষেরা বইমেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখেন, নতুন বই সংগ্রহ করেন এবং লেখকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ফলে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং এটি হয়ে ওঠে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের মিলনমেলা।

তবে এবারের আয়োজন নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। পবিত্র রমজান মাস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। প্রকাশকদের আশঙ্কা, পাঠকের উপস্থিতি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে। তবুও তারা আশাবাদী যে বইমেলার প্রতি মানুষের ভালোবাসা এতটাই গভীর যে সময়ের বাধা তা থামাতে পারবে না। আয়োজকরাও একই সুরে বলছেন, বইমেলা কেবল একটি আয়োজন নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষের অংশগ্রহণেই পূর্ণতা পায়।

লেখক সমাজের মধ্যেও বইমেলাকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই নতুন বই প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ করেছেন, কেউ কেউ শেষ মুহূর্তের সম্পাদনায় ব্যস্ত। তরুণ লেখকদের জন্য এই মেলা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই তারা প্রথমবারের মতো পাঠকের সামনে নিজেদের লেখা তুলে ধরার সুযোগ পান। আবার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের জন্য এটি পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অন্যতম সেরা প্ল্যাটফর্ম। বইমেলায় পাঠক-লেখকের সরাসরি আলাপচারিতা যে আনন্দ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে, তা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া কঠিন।

মেলার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও আয়োজকরা সতর্ক। দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন প্রবেশ ও চলাচল নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রবেশপথ, বের হওয়ার পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা—সবকিছু প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ব্যবস্থা থাকবে।

বইমেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিদিন বিকেলে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, সংগীতানুষ্ঠান ও স্মরণসভা আয়োজন করা হবে। এসব আয়োজন বইমেলাকে একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মসূচির পরিকল্পনাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বইমেলা বাঙালির আবেগের সঙ্গে এতটাই জড়িত যে এটি কেবল রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও এই সময় ঢাকায় আসেন। পরিবার নিয়ে বইমেলায় ঘোরার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে বছরের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকে। ছোটরা নতুন গল্পের বই হাতে পেয়ে যেমন উচ্ছ্বসিত হয়, তেমনি বড়রাও প্রিয় লেখকের নতুন প্রকাশনা সংগ্রহে আনন্দ পান।

সাহিত্য বিশ্লেষকদের মতে, বইমেলা একটি দেশের বৌদ্ধিক মানচিত্রের প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রকাশিত বইয়ের বিষয়বস্তু, লেখকদের বৈচিত্র্য এবং পাঠকের আগ্রহ দেখে সমাজের চিন্তাধারা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই এই মেলা কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যা একটি জাতির মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে প্রস্তুতির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে বইমেলা যেন নতুন এক উচ্ছ্বাসের বার্তা দিচ্ছে। নির্মাণকাজের শব্দ, রঙের গন্ধ আর ব্যস্ত মানুষের পদচারণা জানান দিচ্ছে—অপেক্ষা আর বেশি নয়। কয়েক দিনের মধ্যেই এই প্রাঙ্গণ ভরে উঠবে বইপ্রেমীদের কোলাহলে, নতুন বইয়ের ঘ্রাণে এবং সাহিত্যচর্চার প্রাণবন্ত আলোচনায়। সময়ের বাধা পেরিয়ে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে সেই প্রতীক্ষিত উৎসব, যেখানে বই হবে কেন্দ্র, আর মানুষ হবে তার প্রাণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত