ইউরোপে বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমছে, চ্যালেঞ্জ বাড়ছে রফতানিতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমছে

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম ইউরোপীয় বাজারে কমতে শুরু করেছে, যা দেশের রফতানিকারীদের জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য গত এক বছরে প্রায় চার শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে গত ডিসেম্বর মাসে দাম ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চাহিদা হ্রাস এবং মার্কিন শুল্কের প্রভাব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা রফতানি খাতে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

চলতি অর্থবছর জুলাই থেকে রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ দিয়েও জানুয়ারি পর্যন্ত পরবর্তী ছয় মাসে তা বৃদ্ধি পায়নি। পোশাক শিল্প মালিকরা জানান, তৈরি পোশাক খাতের এই হ্রাসের পেছনে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ এবং দাম কমানো প্রধান কারণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দফতর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পোশাকের গড় দাম বছরে ৩.৮৪ শতাংশ কমেছে।

বিজিএমইএর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, চীন ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাপের মুখে পড়ায় তারা এখন ইউরোপের বাজার দখলের চেষ্টা করছে। তাদের কাঁচামাল ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী হওয়ায় কম দামে পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। “যে পণ্য আমরা পাঁচ ডলারে দিতাম, চীন সেটি চার ডলারে দিচ্ছে। ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই কম দামে কিনতে আগ্রহী। ফলে বাংলাদেশি রফতানিকারীদের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে।”

ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমলেও মার্কিন শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিমুখ দেশগুলো এখন ইউরোপে বেশি অর্ডার নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। রশিদ আহমেদ হোসাইনী আরও বলেন, বাংলাদেশ বাজার হারাচ্ছে এবং এটি পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে ভর্তুকির আবেদন করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ভর্তুকি আমাদের শিল্প মালিকদের জন্য নয়, বরং শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য। যদি আমরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারি এবং ভারত-চীন বাজার দখল করে নেয়, দেশের কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে।”

বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করতে ৬-১৯ বছর সময় লেগেছে। বাংলাদেশ যদি তিন বছরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে পারে, তবে তা দেশের রফতানিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, “২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে যদি চুক্তি সম্ভব হয়, তবে তা দেশের জন্য বড় সুযোগ। অন্যান্য বাণিজ্য ব্লকের সঙ্গে চুক্তি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।”

অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের ওপর ইউরোপীয় বাজারে চাপ আরও বাড়বে। তারা বলেন, ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য সম্প্রসারণের আগ্রহকে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিশ্ববাজারে গার্মেন্টস খাত এখন তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে আগ্রহী হতে পারে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে এবং নিজেদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে।”

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। এর প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে গেছে। তবে বাজারে দাম কমার কারণে রফতানি আয় ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি বাংলাদেশ সরকার এবং শিল্প মালিকরা যৌথ উদ্যোগ নেন, সরকারি ভর্তুকি ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুফল কাজে লাগান, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

বাংলাদেশি পোশাক শিল্পের জন্য এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের দিক থেকেও গুরুতর। ফলে নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাজার সম্প্রসারণ, রফতানি প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মোকাবিলায় সরকার ও শিল্প মালিকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত