প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তার উপস্থিতিকে ঘিরে একদল যুবকের ‘রাজাকার’ স্লোগান এবং পাল্টা হিসেবে জামায়াত কর্মীদের প্রতিক্রিয়ামূলক স্লোগানকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা, যা মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী, উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২২ মিনিটে ডা. শফিকুর রহমান শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এটি ছিল তার দলীয় ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রথমবারের মতো একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় পরিবেশ ছিল শান্ত ও নিয়মতান্ত্রিক। ভাষা শহীদদের স্মরণে নীরবতা পালন, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সংক্ষিপ্ত প্রার্থনার মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান জামায়াত আমির ও তার সঙ্গে থাকা নেতারা। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলেন এবং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানান।
তবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সেখানে উপস্থিত একদল যুবক তাকে লক্ষ্য করে ‘রাজাকার, রাজাকার’, ‘একাত্তরের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’ এবং ‘একাত্তরের রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’—এ ধরনের স্লোগান দিতে শুরু করেন। স্লোগানগুলো ক্রমেই জোরালো হতে থাকলে আশপাশের মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতের সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মীরাও পাল্টা স্লোগান দিতে শুরু করেন। তারা ‘ভাষাসৈনিক গোলাম আযম, লও লও লও সালাম’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। দুই পক্ষের এই স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে মুহূর্তেই শহীদ মিনারের পবিত্র পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হলে সেখানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত সক্রিয় হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন বিরোধীদলীয় জোটের নেতারা। হট্টগোল শুরু হলে তারা দ্রুত জামায়াত আমিরের গাড়ির কাছে ফিরে আসেন এবং তাকে নিরাপদে বের করে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। পরিস্থিতি আরও অবনতির আগেই পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন এবং নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ডা. শফিকুর রহমান ও তার সঙ্গে থাকা নেতারা নিরাপদে শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করেন। পরে সেখানে উপস্থিত অন্য রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন অব্যাহত রাখেন।
এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শহীদ মিনার শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ, ভাষার অধিকার এবং স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক। ফলে সেখানে যেকোনো রাজনৈতিক উপস্থিতি বা প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
অনেকেই মনে করছেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন হিসেবে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। আবার অন্য একটি অংশ মনে করছে, শহীদ মিনারের মতো একটি জাতীয় আবেগের স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত এবং তা এড়িয়ে চলা উচিত।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন সাধারণ মানুষ জানান, তারা মূলত ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে স্লোগান শুরু হলে তারা বিস্মিত হন। অনেকেই বলেন, শহীদ মিনারের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক থাকা উচিত, কারণ এটি কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের জায়গা নয়, বরং এটি জাতির গর্ব ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শহীদ মিনার এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন ছিল এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত ছিলেন। তাদের দ্রুত পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ বা সহিংসতা ঘটেনি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি গৌরবময় ও বেদনাবিধুর দিন। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর লাখো মানুষ শহীদ মিনারে সমবেত হন। এই দিনটি শুধু শোকের নয়, বরং এটি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতীক।
এই প্রেক্ষাপটে শহীদ মিনারে ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতি এবং তাকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া প্রতিক্রিয়া নতুন করে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।
একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, ভাষা শহীদদের স্মৃতি শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, বরং এটি এখনো জাতির আবেগ, পরিচয় এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।