এলডিসি উত্তরণ পেছাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের চিঠি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
এলডিসি উত্তরণ পেছাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের চিঠি

প্রকাশ:  ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশ নতুন করে সময় চেয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এই আবেদন পাঠানো হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়েছেন জাতিসংঘ-এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি-এর চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে। চিঠিতে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক—সবগুলোতেই উত্তীর্ণ হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় উত্তরণের প্রস্তুতির সময়কাল নানা কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর আঘাত হেনেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মহামারির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের সংঘাত, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের উত্তরণ-প্রস্তুতিকে জটিল করে তুলেছে। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে এবং শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। এর ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও উত্তরণের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্থিক খাতে অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতীয় বাজেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, এসব কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগের হার নিম্নমুখী হয়েছে এবং কর-জিডিপি অনুপাত প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য যে প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বরং সরকারের মনোযোগ দিতে হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকে।

বাংলাদেশের জন্য এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হলেও এর সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এলডিসি মর্যাদা থাকার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। উত্তরণের পর এসব সুবিধা কমে যেতে পারে, যা দেশের রপ্তানি খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সম্ভাব্য শুল্ক নীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি সম্মানজনক অর্জন হলেও এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন। যদি যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ ঘটে, তাহলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সময় বাড়ানোর এই আবেদনকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের আশঙ্কা, এলডিসি সুবিধা হারালে দেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং অন্যান্য রপ্তানিনির্ভর শিল্প খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালে এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালে সিডিপির মূল্যায়নে এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে। তখন ২০২৪ সালে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে সময়সীমা দুই বছর পিছিয়ে ২০২৬ সালের নভেম্বরে নির্ধারণ করা হয়।

বর্তমানে সরকার মনে করছে, চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য আরও সময় প্রয়োজন। সময় বাড়ানো হলে অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়। চলতি মাসের শেষ দিকে সিডিপির বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। অতীতে কয়েকটি দেশের এলডিসি উত্তরণ স্থগিত বা পিছিয়ে দেওয়ার নজির থাকায় বাংলাদেশও ইতিবাচক সিদ্ধান্তের আশা করছে।

বাংলাদেশের এই আবেদন দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এটি একদিকে যেমন উন্নয়ন অর্জনের স্বীকৃতি, অন্যদিকে বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সময় চাওয়ার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত