প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তান ক্রিকেটে একটি নাম যেন কখনোই আলোচনার বাইরে থাকে না—বাবর আজম। দলের পারফরম্যান্স ভালো হোক বা খারাপ, জয়ের আনন্দে মাতুক কিংবা পরাজয়ের বেদনায় ডুবে থাকুক, প্রতিটি পরিস্থিতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন এই তারকা ব্যাটসম্যান। তবে চলতি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন, নতুন বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আরেকটি পরিচিত নাম—ফখর জামান।
সুপার এইটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে পাকিস্তান দলে এক ধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করছে। সমর্থক, বিশ্লেষক এবং সাবেক ক্রিকেটারদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে একই প্রশ্ন—দলের প্রয়োজনে কি এবার বাবরের জায়গায় সুযোগ পাবেন ফখর? নাকি দলের আস্থার প্রতীক হিসেবেই আবারও মাঠে নামবেন বাবর?
বাবর আজম পাকিস্তানের টি–টোয়েন্টি ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যানদের একজন। আন্তর্জাতিক টি–টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রহের রেকর্ড তার দখলে। ৪৫৭১ রানের এই বিশাল সংগ্রহ তার প্রতিভা ও ধারাবাহিকতার প্রমাণ দেয়। তবে সংখ্যার এই উজ্জ্বলতা সব সময় বর্তমান বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে টি–টোয়েন্টির মতো দ্রুতগতির খেলায় বর্তমান ফর্মই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।
চলতি বিশ্বকাপে বাবরের ভূমিকা বদলে গেছে। দীর্ঘদিন ওপেনার হিসেবে খেললেও এবার তাকে খেলানো হচ্ছে চার নম্বরে। এই পরিবর্তনই যেন তার স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করেছে। তিন ম্যাচে মাত্র ৬৬ রান করেছেন তিনি, যার মধ্যে ৪৬ রান এসেছে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। বড় ম্যাচে তার ব্যাট নীরব থাকায় দলীয় কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে সেই ম্যাচটি নিয়ে, যেখানে তিন উইকেট পড়ে যাওয়ার পরও বাবরকে দ্রুত ব্যাটিংয়ে নামানো হয়নি। তার আগে ক্রিজে পাঠানো হয় অন্য ব্যাটসম্যানদের। এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—দ্রুত রান তোলার ক্ষেত্রে দল এখন বাবরের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারছে না।
পরিসংখ্যানও এই বাস্তবতাকে কিছুটা সমর্থন করে। টি–টোয়েন্টিতে চার নম্বরে বাবরের পারফরম্যান্স খুব বেশি শক্তিশালী নয়। সাত ইনিংসে তার গড় ৩০.৮৩ হলেও স্ট্রাইক রেট মাত্র ১১৮.৫৮, যা আধুনিক টি–টোয়েন্টির চাহিদার তুলনায় কম। এই পজিশনে ব্যাটসম্যানের কাছে দল সাধারণত দ্রুত রান তোলার প্রত্যাশা করে, যা ম্যাচের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে ফখর জামানের নাম উঠলেই মনে পড়ে তার বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের কথা। প্রথম বল থেকেই বড় শট খেলার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তোলে। টি–টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে চার নম্বরে ২১ ইনিংসে ৫০১ রান করেছেন তিনি। যদিও তার গড় ২৫.০৫, যা খুব বেশি উজ্জ্বল নয়, তবে তার স্ট্রাইক রেট ১৫০.৪৫—যা টি–টোয়েন্টির জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
ফখরের ব্যাটিং স্টাইল পাকিস্তানের বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক। কারণ টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে এখন আর শুধু উইকেটে টিকে থাকা নয়, বরং প্রতিটি বল থেকে রান বের করে আনার সক্ষমতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তবে বাবরের পক্ষে একটি বড় যুক্তি রয়েছে—নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত রেকর্ড। এই দলের বিপক্ষে ২৪ ইনিংসে আটটি অর্ধশতক ও একটি শতকসহ ৮৮০ রান করেছেন তিনি। এই পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, নিউজিল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে তিনি কতটা স্বচ্ছন্দ।
কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। এই সাফল্যের বেশিরভাগই এসেছে ওপেনার হিসেবে খেলতে গিয়ে। চার নম্বরে তার অভিজ্ঞতা সীমিত, এবং সেই জায়গায় তিনি এখনো নিজের সেরাটা দেখাতে পারেননি।
পাকিস্তান দলের জন্য এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া বা নেওয়ার বিষয় নয়। এটি দলের কৌশল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং মানসিক অবস্থার সঙ্গেও জড়িত। বাবর আজম শুধু একজন ব্যাটসম্যান নন, তিনি দলের সাবেক অধিনায়ক এবং দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের প্রতীক। তাকে বাদ দেওয়া মানে দলের একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা।
অন্যদিকে ফখর জামান দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষা করছেন নিজের সুযোগের জন্য। একসময় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি নিয়মিত সুযোগ পাননি। এই বিশ্বকাপে এখনো মাঠে নামার সুযোগ না পাওয়াটা তার জন্য হতাশাজনক।
ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত অনেক এসেছে, যখন একটি কঠিন সিদ্ধান্তই দলের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেটও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন প্রশ্ন একটাই—দল কি অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখবে, নাকি বর্তমান ফর্ম ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্ত নেবে?
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু একটি সাধারণ ম্যাচ নয়। এটি পাকিস্তানের জন্য একটি পরীক্ষা, যেখানে শুধু প্রতিপক্ষের বোলারদের নয়, নিজেদের ভেতরের দ্বিধা-দ্বন্দ্বকেও জয় করতে হবে।
সমর্থকদের চোখ এখন নির্বাচকদের দিকে। তারা অপেক্ষা করছেন সেই ঘোষণার জন্য, যা হয়তো পাকিস্তান ক্রিকেটের এই অধ্যায়ের নতুন মোড় নির্ধারণ করবে।