কক্সবাজারে ইয়াবা দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বড় লড়াই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
কক্সবাজারে ইয়াবা দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বড় লড়াই

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের জেলা কক্সবাজার বহু বছর ধরেই এক নীরব সংকটের ভার বহন করে চলেছে। পর্যটনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই জেলাই এখন দেশের সবচেয়ে বড় মাদক প্রবেশদ্বার হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে ইয়াবা নামের ভয়ঙ্কর মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেনি, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ-এর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নাম এখন ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ।

স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সংকট নতুন নয়। বহু বছর ধরে সীমান্তবর্তী টেকনাফ ও উখিয়া হয়ে ইয়াবার চালান দেশে ঢুকছে। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার-এর বিভিন্ন গোপন কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবা নাফ নদী, পাহাড়ি পথ ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গত দুই বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রতিদিন গড়ে লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের ভাষায়, বাজারে ইয়াবার সহজলভ্যতা কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েছে।

এই বাস্তবতা নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি একটি বড় সুযোগও। কারণ তিনি নিজেই এই জেলার নির্বাচিত প্রতিনিধি। ফলে কোথায় দুর্বলতা, কারা এই চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে, কোন রুট বেশি ঝুঁকিপূর্ণ—এসব বিষয়ে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তিনি যদি এই সংকট নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সফলতা দেখাতে পারেন, তবে তা শুধু কক্সবাজার নয়, পুরো দেশের মাদকবিরোধী অভিযানে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের মধ্যে নতুন করে তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং অন্যান্য বাহিনী সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছে। বিশেষ করে রাতের নৌ চলাচল, পাহাড়ি গিরিপথ এবং সন্দেহজনক যানবাহনের ওপর বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন না আসায় এবার প্রযুক্তিনির্ভর ও গোয়েন্দাভিত্তিক অপারেশন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি, সন্দেহজনক রুটে বিশেষ মোবাইল ইউনিট স্থাপন এবং মাদক মামলার তদন্তে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, গত কয়েক বছরে অনেক মামলার রায় হয়েছে এবং অনেক আসামি সাজা পেয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৪৪টি মামলার মধ্যে ১০৩ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এবং ৩০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও মাদক চক্রের শক্তি এখনো কমেনি।

তার মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন পাচারকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। সীমান্ত থেকে ইয়াবা এনে প্রথমে ক্যাম্পের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়, পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি অর্থের লোভে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

তিনি আরো জানান, মাদক শনাক্তকরণে ড্রাগ ডিটেকশন ডগ বা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের সংখ্যা খুবই সীমিত। অথচ বড় চালান শনাক্ত করতে এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেন, বাস, কার্গো বা ব্যক্তিগত মালামালে লুকানো ইয়াবা শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি এই কুকুরগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।

এদিকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই জেলার প্রায় ২৮ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য অনেক তরুণকে ইয়াবা পাচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে।

তার ভাষায়, একজন তরুণ যদি প্রতিদিন সম্মানজনক উপায়ে আয় করতে পারে, তবে সে কখনোই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাদক কারবারে যুক্ত হবে না। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও অত্যন্ত জরুরি।

স্থানীয়দের মতে, ইয়াবা কারবার এখন আর শুধু সংগঠিত অপরাধচক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। একজন সদস্য মাদক পরিবহন করলে অন্য সদস্যরা তা সংরক্ষণ বা বিতরণের কাজে সহায়তা করছে। ফলে এই নেটওয়ার্ক ভাঙা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ছয় মাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যেই তার নেওয়া পদক্ষেপ এবং বাস্তব ফলাফল প্রমাণ করবে, তিনি দীর্ঘদিনের এই মাদক সাম্রাজ্য ভাঙতে কতটা সক্ষম।

তবে চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, প্রত্যাশাও ততটাই বেশি। কক্সবাজারের মানুষ এখন অপেক্ষা করছে একটি বাস্তব পরিবর্তনের জন্য। তারা চায় তাদের জেলা আবার পর্যটনের জন্য পরিচিত হোক, মাদকের জন্য নয়।

এই সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জিততে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এখন দেখার বিষয়, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এই কঠিন পরীক্ষায় কতটা সফল হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত