রমজান মাস: নেকি ও পুণ্যের ভরা বসন্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
রমজান মাস: নেকি ও পুণ্যের ভরা বসন্ত

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে রমজান মাসকে সর্বাধিক পবিত্র ও বরকতময় মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছয় ঋতুর মধ্যে বসন্তকালকে বলা হয় ঋতুরাজ, কারণ এ ঋতুতে প্রকৃতি চমৎকারভাবে সাজে, সবুজ ঘাস, ফুলের সুবাস ও ফলের মিষ্টি গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক তেমনি, রমজান মাসকে নেকি ও পুণ্য অর্জনের ভরা বসন্ত হিসেবেও ধরা হয়। এ মাস আল্লাহর রহমত, মাগফেরাত, নাজাত এবং অসংখ্য বরকত ও ফজলে ভরপুর। হজরত আহমদ সেরহিন্দ মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.) বলতেন, রমজানে এত বেশি রহমত বর্ষিত হয় যে বাকি এগারো মাসের রহমতও ম্লান হয়ে যায়, যেমন এক বিন্দু জল বিশাল সমুদ্রকে ম্লান করে দেয়।

ঐতিহাসিক ও মনীষী ব্যক্তিবর্গের সাক্ষ্য অনুযায়ী, রমজান মাসে নেকি ও পুণ্য অর্জনে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো হতো। আব্দুল কাদের রায়পুরি (রহ.) শাবান মাসের শেষ দিনে ভক্ত-মুরিদদের ডেকে বলতেন, যদি হায়াতে বেঁচে থাকি রমজানের পর দেখা হবে। তিনি খাদেমকে একটি ছোট বস্তা দিয়ে বলেন, এ মাসে আসা সব চিঠি-পত্র এখানে ভরে রাখবে। রমজানের প্রতিটি দিন তিনি আল্লাহর গোলামির পেছনে নিজেকে উৎসর্গ করতেন এবং মসজিদে অবস্থান করে ভক্তদেরও অংশগ্রহণ করাতেন। সমগ্র মসজিদ মাসজুড়ে ভরে উঠত এবং মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে ইবাদতে মগ্ন থাকত।

শাইখুল হাদিস যাকারিয়া (রহ.) রমজানে নিজেকে শতভাগ ইবাদতে ব্যস্ত রাখতেন। প্রতিটি দিন কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে পার করতেন। তিনি নাওয়াফেল ও জিকির-আজকারও নিয়ম করে আদায় করতেন। একবার তাঁর ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু জোহরের পর তাঁর সাক্ষাতে আসলে তিনি শুধু সালামের জবাব দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তেলাওয়াত শুরু করেন। বন্ধু তখন বলেছিলেন, “ভাই, আমাদের কাছে রমজান এসেছে, তবে আপনার কাছে যেভাবে এসেছে সেভাবে নয়।”

শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি (রহ.) প্রতিটি রাতে তারাবি নামাজ দীর্ঘ করতেন এবং কখনও কখনও সেহরির সময় পর্যন্ত নামাজে থাকতেন। তার পরিবারের লোকেরা তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিত। একবার তিনি অসুস্থ থাকলেও কারি সাহেবের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে দীর্ঘ তেলাওয়াত চালিয়ে গেছেন। তাঁর ছাত্র ও রমনীগণ প্রতি রমজানে তারাবিতে সাত খতম কুরআন পাঠ শুনতেন।

হজরত সুফিয়ান সাওরি (রহ.) রমজানে অন্যান্য নফল ছেড়ে দিয়ে অধিকাংশ সময় কুরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত থাকতেন। ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) প্রতি রমজানে ৬৩ খতম কুরআন পাঠ ও শোনতেন। রাতে এক খতম, দিনে এক খতম এবং তারাবিতে তিন খতম করে সমগ্র মাস শেষ করতেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) রাত-দিন মিলিয়ে দুই খতম করে মাসজুড়ে মোট ৬০ খতম সম্পন্ন করতেন। ইমাম বুখারি (রহ.) প্রতি রমজানে ৩০ খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন।

অন্যান্য বহু ইমাম ও মনীষীগণও রমজানে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতেন। কেউ প্রতি তিন দিনে, কেউ প্রতি পাঁচ দিনে, আবার কেউ প্রতি সপ্তাহে একটি খতম সম্পন্ন করতেন। বর্তমানেও কিছু পীর, আওলিয়া ও মনীষী ব্যক্তি নিজ নিজ খানকায় বা প্রতিষ্ঠানে রমজান মাস ব্যাপী তাসাওউফ ও মা’রেফতে ইলাহির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে ভক্ত-মুরিদদের সমন্বয়ে ইবাদত ও সুলুক চালিয়ে যাচ্ছেন।

রমজান মাসকে আমরা শুধুমাত্র ক্ষুধা-তৃষ্ণা ধৈর্য্য রাখার সময় হিসেবেই নয়, বরং নেকি, পুণ্য, তেলাওয়াত, নাওয়াফেল ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি। এ মাসকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে মুসলিম উম্মাহ প্রতিদিনের জীবনকে নেকি ও পুণ্যে পূর্ণ করতে সক্ষম। বসন্তকাল যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরপুর, তেমনি রমজান মাস মানব জীবনের নেকি ও পুণ্যের বসন্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত