পার্বতীপুরে ট্রাকের ধাক্কায় ভেঙেছে ৩৩ কেভি লাইন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার
পার্বতীপুরে ট্রাকের ধাক্কায় ভেঙেছে ৩৩ কেভি লাইন

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় ভোরের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই পুরো জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থামিয়ে দিয়েছে। কয়লাবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটিতে ধাক্কা দিলে সেটি ভেঙে পড়ে এবং পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার হাবড়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে পার্বতীপুরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে এবং বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজারো মানুষ।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, বড়পুকুরিয়া থেকে ফুলবাড়ীগামী কয়লাভর্তি একটি ট্রাক, যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর কুষ্টিয়া ঢ-১১/২৭২৭, হাবড়া বাজার এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাকটি সরাসরি রাস্তার পাশের ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বিদ্যুতের খুঁটিটি ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার শব্দে আশপাশের মানুষ ছুটে এসে দেখতে পান, ট্রাকটি রাস্তার পাশে আংশিক কাত হয়ে রয়েছে এবং বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে আছে।

দুর্ঘটনায় ট্রাকের চালক ও তাঁর সহকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) পার্বতীপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ লাইনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত কাজ শুরু করেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শুধু একটি খুঁটি নয়, বরং বিদ্যুৎ লাইনের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামত করতে সময়সাপেক্ষ হবে।

পার্বতীপুর নেসকোর আবাসিক প্রকৌশলী সত্যজিৎ দেব শর্মা জানান, দুর্ঘটনার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য কাজ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটি প্রতিস্থাপন এবং লাইনের সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে আমাদের টিম নিরলসভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি বিকল্প সংযোগ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে অন্তত আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা যায়।”

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। সকাল থেকেই দোকানপাট খুললেও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। বিশেষ করে বরফ, মাংস, দুধ ও ওষুধ সংরক্ষণে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। স্থানীয় এক মুদি দোকানদার বলেন, ভোর থেকে বিদ্যুৎ নেই, ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম। দ্রুত বিদ্যুৎ না এলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

অন্যদিকে, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোও বিদ্যুৎ সংকটে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠানে জেনারেটরের ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও তা দীর্ঘ সময় চালানো ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। একজন স্বাস্থ্যকর্মী জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় কিছু চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং রোগীদের সেবাদানে বিঘ্ন ঘটছে।

এদিকে শিক্ষার্থীরাও পড়েছেন ভোগান্তিতে। অনেক শিক্ষার্থী সকালে অনলাইন ক্লাস বা পড়াশোনার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বিদ্যুৎ না থাকায় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে নিয়মিত ভারী যানবাহন চলাচল করে এবং অনেক সময় এসব যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে চলার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। তারা সড়কে ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ খুঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত করে না, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি তৈরি করে। কারণ বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলে অগ্নিকাণ্ড বা প্রাণহানির মতো বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

দুপুরের দিকে নেসকোর প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটি অপসারণ এবং নতুন খুঁটি স্থাপনের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্তত আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা সম্ভব হবে।

এ ঘটনায় পুরো পার্বতীপুরজুড়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং মানুষ দ্রুত সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভারী যানবাহন চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা কতটা জরুরি। কারণ একটি মুহূর্তের অসাবধানতা পুরো একটি জনপদের জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত