শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কোনো দফতরেই দুর্নীতির কোনো ছায়া থাকতে দেওয়া হবে না এবং আগামী পাঁচ বছরে মন্ত্রণালয়ের কোথাও দুর্নীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠবে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, শুধু নিজে দুর্নীতিতে জড়াবেন না, বরং কাউকে দুর্নীতি করতেও দেওয়া হবে না।

শনিবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীতে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও শিক্ষার উন্নয়নের অঙ্গীকারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড এবং এই মেরুদণ্ড দুর্বল হলে কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় বাহ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। তিনি বলেন, ভিত্তি দুর্বল রেখে উপরে বড় ভবন নির্মাণ করলে তা টেকসই হয় না। তাই শিক্ষার ভিতকে মজবুত করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং দায়িত্ব।

শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন, যা তিনি ‘কারিকুলাম, ক্লাসরুম ও কনসিস্টেন্সি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, পাঠ্যক্রম হতে হবে যুগোপযোগী, শ্রেণিকক্ষ হতে হবে কার্যকর ও প্রাণবন্ত, এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় থাকতে হবে ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য। এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে বাংলা, ইংরেজি, কারিগরি এবং মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধারার শিক্ষা চালু রয়েছে। কিন্তু এসব ধারার মধ্যে মানগত পার্থক্য এবং সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি সুষম ও মানসম্মত কাঠামো তৈরি করা জরুরি, যাতে সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পায় এবং একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাতৃভাষার প্রতি সম্মান এবং দক্ষতা অর্জন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ভাষায় সঠিকভাবে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, যা জাতির জন্য চিন্তার বিষয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইংরেজি শেখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার আগে মাতৃভাষায় দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষায় ভাষা ও গণিতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই দুটি বিষয় শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মূল ভিত্তি। তিনি জানান, প্রয়োজনে বর্তমান পাঠ্যক্রম পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, যাতে শিক্ষার গুণগত মান আরও উন্নত করা যায়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। তাই এই বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

তিনি আরও বলেন, দেশপ্রেম শুধু রাজপথে আন্দোলন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হয় নিজের দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার মাধ্যমে। তিনি সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান এবং বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করলে শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি তার বক্তব্যে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন এবং বলেন, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারছে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং একটি আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। সেই চেতনাকে ধারণ করেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে।

এই আলোচনা সভা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের পরিকল্পনা নতুন আশার সঞ্চার করেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই ঘোষণাগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের শিক্ষা খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার মান উন্নয়নের পথ আরও সুগম হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের শিক্ষার্থীদের ওপর। আর সেই শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন একটি সৎ, দক্ষ এবং স্বচ্ছ শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত