বই ও সংস্কৃতি চর্চাই তরুণদের সঠিক পথ দেখায়: খোকন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
বই ও সংস্কৃতি চর্চাই তরুণদের সঠিক পথ দেখায়: খোকন

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের মানসিক বিকাশ—এই তিনটি বিষয়কে এক সুতোয় গেঁথে একটি আলোকিত সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন। তিনি বলেছেন, বিপথগামীতা থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে বই পড়া ও সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো শহীদ মিনার নেই, সেখানে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে এবং সেই চেতনাকে ধারণ করতে পারে।

শনিবার দুপুরে নরসিংদী পৌর পার্কে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আট দিনব্যাপী অমর একুশে বই মেলার উদ্বোধন ও আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আবেগঘন পরিবেশে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি শুধু একটি বই মেলার উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকনির্দেশনা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

অনুষ্ঠানে খায়রুল কবির খোকন ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ শুধু একটি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল জাতির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার ভিত্তি। তিনি বলেন, সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। আর সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সেই স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ইতিহাসকে অনুভব করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শহীদ মিনার শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি প্রতীক—ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। এই প্রতীককে জীবন্ত রাখতে হলে আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে এবং তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।

সমাজের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তরুণদের একটি বড় অংশ বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। অনেকেই বই পড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে তাদের সংযোগ কমে যাচ্ছে। এর ফলে তারা সহজেই বিপথে চলে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বই পড়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, একটি বই মেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি একটি চিন্তার মেলা, একটি জ্ঞানের উৎসব। এখানে এসে মানুষ নতুন ধারণা পায়, নতুন স্বপ্ন দেখে এবং নিজের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নরসিংদীর এই বই মেলা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে এবং এটি একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হবে।

এই বই মেলায় জেলার বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা ও বই বিক্রেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। প্রায় ৪৫টি স্টলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের পাঠকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বই সাজানো হয়েছে। ছোট ছোট শিশুদের হাতে বই নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এবং তরুণদের বইয়ের পাতা উল্টে দেখার দৃশ্য পুরো পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের বই কিনে দিতে আগ্রহ দেখান, যা একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল ফারুক এবং প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারাও বই মেলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, একটি জাতির উন্নয়নের জন্য শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক প্রয়োজন, আর সেই সচেতনতা গড়ে ওঠে বই পড়ার মাধ্যমে।

এর আগে সকালে খায়রুল কবির খোকন জেলার মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়াম সংলগ্ন শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেই সময় পুরো পরিবেশ ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগে ভরা। পরে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে একটি প্রভাতফেরি বের করা হয়, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। প্রভাতফেরিটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা শুধু একটি দিবসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হওয়া উচিত। আমাদের কথা, কাজ এবং চিন্তার মধ্যে সেই চেতনাকে ধারণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়াটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা মানুষকে দ্রুত তথ্য পাওয়ার সুযোগ দিলেও বই পড়ার গভীরতা ও চিন্তার বিকাশের বিকল্প হতে পারে না। একটি ভালো বই মানুষের জীবন পরিবর্তন করতে পারে, তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাতে পারে এবং তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

নরসিংদীর এই বই মেলা শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি একটি বার্তা—জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসার বার্তা। এটি নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা।

খায়রুল কবির খোকনের বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা শুধু নরসিংদীর জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য প্রযোজ্য। একটি সুস্থ, সচেতন এবং আলোকিত সমাজ গড়তে হলে বই পড়া এবং সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই—এই সত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে জাতির জন্ম, সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি বই ও সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হয়, তাহলে সেই আত্মত্যাগই হবে সত্যিকার অর্থে সার্থক। আর সেই লক্ষ্যেই বই মেলার মতো আয়োজনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত