সালমান-আনিসুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৫ বার
সালমান-আনিসুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকায় বহুল আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আজ নতুন অধ্যায় শুরু হলো। জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত অভিযোগিত অপরাধের দায়ে বিচারাধীন সাবেক শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মামলাটি পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এ, যা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

রোববার সকালে ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার কার্যক্রম শুরু করে। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত কক্ষজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। আইনজীবী, প্রসিকিউশন টিম, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের উপস্থিতিতে কার্যক্রম শুরু হয় এক ধরনের নীরব উত্তেজনার আবহে।

এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত ১০ ফেব্রুয়ারি, যখন প্রসিকিউশন তাদের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। তারও আগে, ১২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত সহিংসতা, নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে অভিযুক্তদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যদিও আসামিপক্ষ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং দাবি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রসিকিউশনের হাতে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। তার ভাষ্যমতে, এই মামলায় মোট ২২ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেবেন। প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী এবং তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের পাশাপাশি ভিডিও ফুটেজ, ডকুমেন্টারি উপাদান এবং লাইভ অ্যাভিডেন্স উপস্থাপন করা হবে। প্রসিকিউশন আশা করছে, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে আদালতের কাছে অভিযোগের ভিত্তি সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আদালত সূত্র জানায়, প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ডের মধ্য দিয়ে মামলার মূল শুনানি পর্বে প্রবেশ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে সাক্ষীরা ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার প্রভাব তুলে ধরবেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এখানেই ঘটনার মানবিক ও বাস্তব চিত্র আদালতের সামনে উন্মোচিত হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাও গুরুত্ব পায়। ট্রাইব্যুনালের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সাক্ষ্যগ্রহণ ধাপে নানা আইনি বিতর্ক ও প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। ফলে আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনমনে প্রভাব ফেলে।

মামলাটি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের ভিন্নমুখী বক্তব্য, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর—সব মিলিয়ে এই বিচার কার্যক্রম কেবল একটি ফৌজদারি মামলা নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বিচার প্রক্রিয়া যেন আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে পরিচালিত হয় এবং অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত থাকে।

আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত কয়েকজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বহুদিন ধরে তারা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের মতে, সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া মানে বিচার প্রক্রিয়া বাস্তব অগ্রগতি পেয়েছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল এবং প্রমাণ উপস্থাপনের সময় তা স্পষ্ট হবে।

সালমান এফ রহমান দীর্ঘদিন দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আনিসুল হকও আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে যুক্ত ছিলেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে বিস্ময় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই বিচার কার্যক্রমের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আইনি দৃষ্টান্তের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অতীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার পরিচালনা করে আলোচিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে নতুন ধরনের অভিযোগ নিয়ে বিচার শুরু হওয়া এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আদালতের ভেতরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই তাই দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এই মামলার অগ্রগতির দিকে।

আগামী দিনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ চলবে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি সাক্ষীর জবানবন্দির পর আসামিপক্ষ জেরা করার সুযোগ পাবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তরা আইনের চোখে নির্দোষ—এই নীতি মেনেই কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, আজকের দিনটি মামলার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সাক্ষ্যগ্রহণের সূচনা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নয়, বরং বহু মানুষের প্রত্যাশা, প্রশ্ন এবং উদ্বেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সংবেদনশীল অধ্যায়। আদালতের চূড়ান্ত রায় যা-ই হোক, এই বিচার দেশের বিচারব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত