‘ইনকিলাব’ বিতর্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
‘ইনকিলাব’ বিতর্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপটে উচ্চারিত একটি বক্তব্য ঘিরে নতুন ভাষা বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধ ব্যবহারে আপত্তি জানিয়ে বলেন, বাংলা ভাষাকে ধারণ করতে হলে এমন শব্দ চলতে পারে না। তাঁর বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবী মহলে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা যুক্তি।

শনিবার সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ভাষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন মন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পালন করলেই ভাষার মর্যাদা রক্ষা হয় না, ভাষাকে শুদ্ধভাবে ধারণ করতে হবে। তাঁর দাবি, ‘ইনকিলাব’ শব্দের সঙ্গে বাংলার ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই। এমন বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাঁর মন্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। তবু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জায়গা থেকে তিনি কথা বলছেন বলেও উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাষার ইতিহাস অনন্য। তাই নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা জরুরি। তরুণ প্রজন্মের মুখে ‘ইনকিলাব’ উচ্চারণ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, এ শব্দ এমন এক ভাষিক উৎস থেকে এসেছে যারা একসময় বাংলা ভাষাকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল। ফলে ভাষা রক্ষার প্রশ্নে সচেতনতা প্রয়োজন।

তবে এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরপরই নানা মহল থেকে আপত্তি উত্থাপিত হয়। ভাষাবিদ ও গবেষকদের অনেকে মনে করছেন, বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বহুস্রোতসমৃদ্ধ। আরবি, ফারসি, উর্দু, পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজি এমনকি সংস্কৃত থেকেও অসংখ্য শব্দ শতাব্দীর ব্যবহারে বাংলার অঙ্গ হয়ে গেছে। ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিতে ধার করা শব্দ সময়ের প্রবাহে স্থানীয় উচ্চারণ ও অর্থবিকাশের মধ্য দিয়ে নিজস্ব রূপ পায়।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকও ‘ইনকিলাব’, ‘ফয়সালা’, ‘জিন্দাবাদ’, ‘ইনসাফ’, ‘আজাদি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারে আপত্তি জানালে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তাঁর বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নানা মত প্রকাশ পেতে থাকে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও দৈনিক ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, এসব শব্দ এখন সুন্দর বাংলা শব্দ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।

রাজনৈতিক সংগঠন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারও মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ভাষার রূপতত্ত্ব ও শব্দতত্ত্ব অনুযায়ী ‘বিদেশি শব্দ’ বলে আলাদা কোনো নিষিদ্ধ বিভাগ নেই। তাঁর মতে, যে শব্দ নিজস্ব অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং সাধারণ মানুষ যার অর্থ বুঝতে পারে, তা ভাষার ভেতরেই স্থান করে নেয়। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশন, ইন্টারনেট—এসব শব্দকে এখন আর বিদেশি বলা হয় না। বরং বিকল্প শব্দ প্রয়োগে কখনো বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

ভাষাবিদদের একটি অংশ বলছেন, ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা। সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি মিলিয়ে শব্দের অর্থ ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। বাংলা ভাষার বিবর্তন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মুসলিম শাসনামলে ফারসি ও আরবি উৎসের বহু শব্দ প্রশাসনিক ও সামাজিক জীবনে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজি শব্দের প্রভাব বাড়ে। স্বাধীনতার পরও গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির প্রসারে নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে। এই বহুমাত্রিক প্রভাব মিলিয়েই সমকালীন বাংলা দাঁড়িয়ে আছে।

‘ইনকিলাব’ শব্দটির ঐতিহাসিক ব্যবহার নিয়েও আলোচনায় এসেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লবীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান হিসেবে এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। ফলে অনেকের মতে, শব্দটি কেবল ভাষিক নয়, রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশও বটে। আবার অন্য অংশ বলছেন, ভাষা দিবসের আবহে ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্ন তুলতেই পারেন একজন রাজনৈতিক নেতা।

এই বিতর্কে আরেকটি মাত্রা যুক্ত হয়েছে ‘ভাষিক সাম্প্রদায়িকতা’ প্রসঙ্গে আলোচনায়। সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন, নির্দিষ্ট উৎসের শব্দকে বর্জনের আহ্বান দিলে তা ভাষার বহুত্ববাদী চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাষা সচেতনতা জোরদার করা, কোনো সম্প্রদায় বা ঐতিহ্যকে আঘাত করা নয়।

সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঢেউ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলছেন, ভাষা নিয়ে আবেগ থাকা স্বাভাবিক, তবে তা যেন গবেষণাভিত্তিক হয়। আবার কেউ মন্তব্য করছেন, ভাষা রক্ষার নামে অতিরিক্ত শুদ্ধতাবাদ আরোপ করলে বাস্তব ব্যবহারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করলে দেখা যায়, ভাষা রক্ষার সংগ্রাম ছিল মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ভাষা নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। প্রশ্ন উঠছে, ভাষার শুদ্ধতা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং কে তা নির্ধারণ করবেন। ভাষাবিদদের মতে, অভিধান, ব্যাকরণ ও সাহিত্যিক ব্যবহার মিলেই মান নির্ধারণ হয়, তবে সাধারণ মানুষের কথ্য ব্যবহারের শক্তিও কম নয়।

এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়াবে তা সময়ই বলবে। তবে স্পষ্ট যে, একটি শব্দকে ঘিরে শুরু হওয়া আলোচনা ভাষার ইতিহাস, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আত্মপরিচয়েরও বাহক। তাই শব্দচয়ন নিয়ে মতভেদ থাকলেও আলোচনাটি যেন যুক্তিনির্ভর ও সহনশীল থাকে—এ প্রত্যাশাই এখন প্রবল হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত