প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয় এবং বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক লেনদেনের ধারাবাহিকতায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখন অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা থেকে পূর্ব এশিয়া—বাংলাদেশের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ প্রতিদিন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে রোববারের মুদ্রা বিনিময় হার সাধারণ মানুষ, প্রবাসী পরিবার এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
আজ রোববার লেনদেনের সুবিধার্থে দেশের অনুমোদিত ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার ক্রয় ও বিক্রয় হার প্রকাশ করা হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ এখনও বিনিময় হারে প্রভাব ফেলছে।
আজকের বাজারে মার্কিন ডলারের ক্রয় হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১২১ টাকা ৭০ পয়সা এবং বিক্রয় হার ১২২ টাকা ৭০ পয়সা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের চাহিদা এখনও সর্বোচ্চ। রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে এই মুদ্রার ভূমিকা অপরিসীম। ফলে ডলারের সামান্য ওঠানামাও অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
ইউরোপীয় অঞ্চলের একক মুদ্রা ইউরোর ক্রয় হার রয়েছে ১৪১ টাকা ৫৪ পয়সা এবং বিক্রয় হার ১৪৬ টাকা ৪২ পয়সা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ইউরোর লেনদেনও উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোপের মুদ্রানীতি ও জ্বালানি বাজার পরিস্থিতি ইউরোর বিনিময় হারে প্রভাব রাখছে।
ব্রিটিশ পাউন্ডের ক্রয় হার আজ ১৬২ টাকা ২৫ পয়সা এবং বিক্রয় হার ১৬৭ টাকা ৩০ পয়সা নির্ধারিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই পাউন্ডের দামের দিকে অনেক পরিবারই সতর্ক নজর রাখেন, বিশেষ করে মাসিক রেমিট্যান্স পাঠানোর সময়।
জাপানি ইয়েনের ক্রয় হার ৭৮ পয়সা এবং বিক্রয় হার ৮০ পয়সা। পূর্ব এশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হওয়ায় ইয়েনের লেনদেনও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর ডলারের ক্রয় হার ৯৫ টাকা ৬৫ পয়সা এবং বিক্রয় হার ৯৭ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের জন্য আমিরাতি দিরহাম এবং সৌদি রিয়েলের বিনিময় হার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আজ আমিরাতি দিরহামের ক্রয় হার ৩৩ টাকা ১২ পয়সা এবং বিক্রয় হার ৩৩ টাকা ৪১ পয়সা। সৌদি রিয়েলের ক্ষেত্রে ক্রয় হার ৩২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং বিক্রয় হার ৩২ টাকা ৭৩ পয়সা। উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের পাঠানো অর্থ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। ফলে এই দুটি মুদ্রার বিনিময় হার পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখে।
অস্ট্রেলিয়ান ডলারের ক্রয় হার ৮৫ টাকা ৫৯ পয়সা এবং বিক্রয় হার ৮৭ টাকা ৫৩ পয়সা। উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের কারণে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বেড়েছে। একইভাবে সুইস ফ্রাঁর ক্রয় হার ১৫৫ টাকা ৪৫ পয়সা এবং বিক্রয় হার ১৫৯ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারিত হয়েছে, যা ইউরোপীয় আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত।
চীনের ইউয়ানের ক্রয় হার ১৭ টাকা ৫১ পয়সা এবং বিক্রয় হার ১৭ টাকা ৮৭ পয়সা। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউয়ানের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি ভারতীয় রুপির ক্রয় হার ১ টাকা ৩৩ পয়সা এবং বিক্রয় হার ১ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটন কার্যক্রমে এই মুদ্রার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ, বৈশ্বিক সুদের হার, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্যের মতো নানা উপাদান এতে প্রভাব ফেলে। তাই লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ থেকে হালনাগাদ তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।
প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করে না, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগ ও বিনিয়োগও বাড়ায়। অন্যদিকে শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রা অপরিহার্য। ফলে বিনিময় হার নিয়ে জনসাধারণের আগ্রহ স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।
বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রাবাজারে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গেলে ব্যবসায়িক আস্থা বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও জোরদার হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিও মুদ্রাবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবশেষে উল্লেখ্য, যেকোনো সময় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তিত হতে পারে। তাই লেনদেনের পূর্বে সর্বশেষ হার যাচাই করা বাঞ্ছনীয়।