প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী নাঙ্গারহার প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান ও ড্রোন হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। রোববার ভোরে ঘটে যাওয়া এই হামলায় আরও অনেকে আহত হয়েছেন। আফগান কর্মকর্তারা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং তালেবান সরকার হামলার “উপযুক্ত জবাব” দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গি আস্তানাকে লক্ষ্য করে এই বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনায় ইসলামাবাদ এই অভিযান পরিচালনা করেছে বলে জানা গেছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নাঙ্গারহার ও পাকতিকা প্রদেশের একটি ধর্মীয় স্কুল এবং আবাসিক এলাকায় হামলা চালানো হয়। এতে নারী ও শিশুসহ সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
নাঙ্গারহার প্রদেশের হামলার স্থান পরিদর্শন করেছেন তালেবান নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। তারা জানান, এই ধরনের হামলা আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের উলঙ্ঘন। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরীহ মানুষ ও ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় জানায়, “যথাসময়ে এই হামলার পরিমিত এবং উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
পাকিস্তানের সামরিক এবং তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অভিযান পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) ও তাদের সহযোগীদের সাতটি ক্যাম্প এবং আস্তানাকে লক্ষ্য করে পরিচালনা করা হয়েছে। পাকিস্তান তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ আছে যে আফগানিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে সাম্প্রতিক হামলা হয়েছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় আইএসের একটি সহযোগী সংগঠনকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইসলামাবাদ বারবার তালেবান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যে, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠী যাতে পাকিস্তানে হামলা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। তবে কাবুল উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় পাকিস্তান এই অভিযান চালিয়েছে।
এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু জেলায় একটি নিরাপত্তা বহরে আত্মঘাতী হামলায় একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই সেনা নিহত হন। এছাড়া গত সোমবার বাজাউর এলাকায় আরেক আত্মঘাতী হামলায় অস্ত্রধারীদের সহায়তায় বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি নিরাপত্তা পোস্টের দেয়ালে আছড়ে পড়লে ১১ সেনা ও এক শিশু নিহত হয়। পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলাকারী একজন আফগান নাগরিক।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানটি মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই চালানো হয়েছে, তবে এর প্রভাব সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানে পড়েছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। তারা বলেছে, “এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আফগানিস্তান উপযুক্ত ও সময়মতো জবাব দেবে।”
এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে ইসলামাবাদের তারলাই কালান এলাকার খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে জোহরের নামাজের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ৩১ মুসল্লি নিহত এবং ১৭০ জন আহত হন। ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল আইএস। এছাড়া আফগান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
এই হামলা নতুন করে দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত নিরাপত্তা ও শান্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ইতিমধ্যে সীমান্তভিত্তিক সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে উভয় দেশের নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি প্রতিরোধে একাধিক অভিযান চালিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এই বিমান হামলা এবং তালেবানের প্রতিক্রিয়া দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
তালেবান সরকার ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে পাকিস্তানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, সাধারণ মানুষ এবং ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্য করে করা হামলা অগ্রহণযোগ্য। আফগান কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছে, “এই ধরনের আক্রমণের জবাবে আমাদের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
সংগ্রহকৃত তথ্য অনুসারে, আফগান সীমান্তে নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। স্থানীয় হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় আফগান জনগণের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সতর্ক হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সীমান্ত এলাকায় সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র হতে পারে। তাই উভয় দেশকে সহিংসতা কমানো, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি প্রয়োজন।