কথা কম বলে কাজ বেশি করতে চাই: অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কাজের অঙ্গীকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৮ বার
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কাজের অঙ্গীকার

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন দায়িত্ব নিয়ে প্রথম কর্মদিবসেই সংযত অথচ স্পষ্ট বার্তা দিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানালেন, অযথা বক্তব্য নয়, অগ্রাধিকার হবে বাস্তব কাজ। আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে রোববার দুপুরে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে উঠে আসে তাঁর কাজকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা চললেও তিনি আপাতত নীরব কর্মতৎপরতার ইঙ্গিত দিলেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র দুই দিন পার হয়েছে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, শুরুতেই বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অর্থ খুঁজে পান না তিনি। আগে পরিস্থিতি বুঝতে চান। মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প, রাজস্ব প্রবাহ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ব্যয়—সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান। তাঁর ভাষায়, আগে রিভিউ, পরে রোডম্যাপ।

দেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। বৈশ্বিক মন্দার অভিঘাত, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভ চাপ—এসব বাস্তবতা নতুন মন্ত্রীর সামনে স্পষ্ট। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নীতিগত উচ্চারণের বদলে প্রশাসনিক পর্যালোচনায় জোর দেওয়া অনেকের কাছেই ইতিবাচক বার্তা। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই কাঠামোগত সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সেই জায়গায় মন্ত্রীর সতর্ক অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ছিল মূলত প্রাথমিক পরিচিতি ও অবস্থা পর্যালোচনার অংশ। জানা গেছে, চলমান বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি, ব্যয়ের গতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের জটিলতা, এবং সময়সীমা রক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে বিলম্ব দীর্ঘদিনের সমস্যা। নতুন নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে কী কৌশল নেয়, তা দেখার অপেক্ষা এখন নীতি বিশ্লেষকদের।

মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি নিজ দফতরে কতদিন সরাসরি কাজ করবেন। জবাবে তিনি বলেন, দায়িত্বের চাপ ও কাজের অগ্রাধিকারের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। তাঁর বক্তব্যে এক ধরনের বাস্তববাদী সুর স্পষ্ট। নির্দিষ্ট সময়সীমা না দিয়ে তিনি কাজের পরিমাণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, প্রশাসনিক কাঠামো বুঝে নিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংবাদমাধ্যম প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্যও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। নিজেকে প্রেস ফ্রেন্ডলি বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, সময়মতো সব জানানো হবে। তথ্যপ্রবাহে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আশ্বাস সংবাদকর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। কারণ অর্থনীতি বিষয়ক সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে। বাজেট, করনীতি, ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—সব ক্ষেত্রেই তথ্যের স্বচ্ছতা আস্থা গড়ে তোলে।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় দেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর কেন্দ্রস্থল। রাজস্ব আহরণ থেকে শুরু করে উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ, বৈদেশিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন—সবখানেই এই দফতরের ভূমিকা নির্ধারক। ফলে নতুন মন্ত্রীর প্রতিটি সিদ্ধান্ত অর্থনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী মহলে নীতি স্থিতিশীলতার দাবি জোরালো হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা চান পূর্বানুমেয় করনীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত, এবং প্রকল্প অনুমোদনে জটিলতা কমানো। নতুন মন্ত্রী এসব বিষয়ে কী বার্তা দেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও প্রথম দিনেই তিনি বড় ঘোষণা দেননি, তাঁর কাজমুখী অবস্থান ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের অপেক্ষার আবহ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে সামাজিক খাতেও রয়েছে প্রত্যাশা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী—এসব খাতে বরাদ্দের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। উন্নয়ন ব্যয়ের মানোন্নয়ন ছাড়া প্রবৃদ্ধির সুফল সুষমভাবে পৌঁছানো কঠিন। পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার হলে প্রকল্প নির্বাচন ও মূল্যায়নে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে বলে অনেকে আশা করছেন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নতুন মন্ত্রীর আগমনকে অনেকে নীতিগত পুনর্বিন্যাসের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে তিনি নিজে আপাতত সংযত। তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস আছে, আছে দায়িত্ববোধের ইঙ্গিত। অযথা প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দিয়ে কথা বলার মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে সেখানে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক শৃঙ্খলা, এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস। বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, করজাল সম্প্রসারণ, আর্থিক খাতে সুশাসন—এসব ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। নতুন মন্ত্রী যদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে মনোযোগ দেন, দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলতে পারে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরও সরল। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমুক। কর্মসংস্থান বাড়ুক। আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য কিছুটা স্বস্তি দিক। এসব প্রত্যাশা পূরণ সহজ নয়, তবু নীতিনির্ধারকদের প্রতিটি পদক্ষেপে সেই চাপ কাজ করে। নতুন মন্ত্রী সেই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন বলেই মনে হয়েছে তাঁর বক্তব্যে।

দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই তিনি যে সতর্কতা দেখালেন, তা প্রশাসনিক পরিপক্বতার ইঙ্গিত বহন করে। দ্রুত সিদ্ধান্তের যুগে ধীর পর্যালোচনা অনেক সময় স্থিতিশীল ফল দেয়। এখন নজর থাকবে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপে। রিভিউ শেষে কী অগ্রাধিকার ঠিক করেন, কোন খাতে জোর দেন, আর কীভাবে সমন্বয় গড়ে তোলেন—সেই দিকেই তাকিয়ে থাকবে অর্থনৈতিক মহল।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে দক্ষ নেতৃত্ব প্রয়োজন। নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্যে কাজের প্রতি অঙ্গীকার স্পষ্ট হয়েছে। সময় বলবে, সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তব সাফল্যে রূপ নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত