প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন কক্সবাজারের প্রবীণ আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্না। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তার নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আইনজীবী মহল, শিক্ষাঙ্গন থেকে সামাজিক সংগঠন—সব জায়গাতেই তাকে ঘিরে প্রত্যাশা ও আলোচনা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০টির মধ্যে বড় একটি অংশ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির ভেতরে এসব আসনে কারা মনোনয়ন পাবেন, তা নিয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ব্যাপক আলোচনা চলছে। এ প্রেক্ষাপটে কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং পরীক্ষিত নাম হিসেবে সামনে এসেছে অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্নার নাম।
তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় আশির দশকের শুরুতে। ১৯৮২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এ অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সে সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তাল, আর সেই প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তিনি নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত করেন। ১৯৮৪ সালে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর তিনি আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে আইন পেশায় যুক্ত হন।
১৯৮৬ সালে তিনি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি-এর সদস্য হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। সেই সময় থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি আইন অঙ্গনে সক্রিয় রয়েছেন। অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন দক্ষ, সাহসী এবং ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আইন পেশার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন। বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি কক্সবাজার জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দক্ষতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয়তার কারণে তিনি জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে অনুষ্ঠিত জেলা সম্মেলনে তিনি কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই সময় দলের জন্য ছিল এক কঠিন অধ্যায়, যেখানে নেতাকর্মীরা নানা সংকটের মুখোমুখি ছিলেন।
দলের এই সংকটময় সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলায় আইনি সহায়তা প্রদান, সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ ছিল, তারা যখন আইনি ও রাজনৈতিকভাবে চাপে ছিলেন, তখন অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্না বিনা পারিশ্রমিকে তাদের মামলা পরিচালনা করেছেন এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তার পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আসে ২০০১ সালে, যখন তিনি দেশের প্রথম নারী পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি আইন অঙ্গনে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং নারী আইনজীবীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তিনি নিজেও জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক প্রতিকূল সময় তার জীবনে সহজ ছিল না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে একাধিকবার তাকে আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছে। তবুও তিনি তার অবস্থান থেকে সরে যাননি এবং সবসময় দলের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। তার ভাষায়, রাজনীতি তার কাছে প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি আসনেই বিএনপির বিজয় অনেকেই তার সাংগঠনিক দক্ষতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করেন, তার নেতৃত্বে দল একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সামাজিক নেতারাও তার পক্ষে মত দিয়েছেন। কক্সবাজার সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস. এম. আকতার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য একজন সংগ্রামী, অভিজ্ঞ এবং পরীক্ষিত নেতার প্রয়োজন, যিনি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। তার মতে, অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্না সেই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অধিকারী।
আইনজীবী মহলেও তার প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। আইনজীবী নেতারা মনে করেন, তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন মানবিক আইনজীবী, যিনি সবসময় ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কক্সবাজারের অনেক আইনজীবী তাকে একজন সাহসী ও নির্ভীক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সামাজিক সংগঠনগুলোর নেতারাও তাকে একজন জনবান্ধব নেতা হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, তিনি সবসময় নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের অবদান। এসব দিক বিবেচনায় অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্না একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত দল কাকে মনোনয়ন দেবে, তা নির্ভর করবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর। তবুও স্থানীয় পর্যায়ে তাকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
কক্সবাজার ও বান্দরবানের মানুষের আশা, তাদের অঞ্চলের একজন অভিজ্ঞ, সাহসী এবং জনবান্ধব নেতা জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে এখন যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, সেটি হলো অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্না।
রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় তিনি যেমন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অর্জন করেছেন আস্থা ও সম্মান। এখন দেখার বিষয়, সেই আস্থা ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জায়গা পান কি না।