প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির অস্থির সময়ের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আবারও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এখনই পুতিনকে থামানো না গেলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে গোটা বিশ্বের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কিয়েভের সরকারি সদর দপ্তর থেকে এসব মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজধানী শহরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, ইউক্রেন হার মানার জন্য নয়, বরং জয় অর্জনের জন্য লড়াই করছে।
জেলেনস্কি বলেন, তার দৃষ্টিতে রাশিয়ার আগ্রাসন শুধু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী একটি বৃহত্তর সংঘাতের সূচনা। তিনি বিশ্বাস করেন, পুতিনের লক্ষ্য কেবল ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল করা নয়, বরং বিশ্বের ওপর একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া। তার ভাষায়, এটি মানুষের স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়া জীবনধারার বিরুদ্ধে একটি সরাসরি আঘাত।
তিনি বলেন, পুতিন ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন, এখন প্রশ্ন হলো তিনি কতদূর এগোতে পারবেন এবং কীভাবে তাকে থামানো সম্ভব। জেলেনস্কি মনে করেন, এর একমাত্র কার্যকর উপায় হলো রাশিয়ার ওপর শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা, যাতে মস্কোকে পিছু হটতে বাধ্য করা যায়।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চল নিয়ে রাশিয়ার অবস্থান নিয়েও তিনি কথা বলেন। বর্তমানে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০ শতাংশ এখনও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে কিছু ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার আলোচনা চলছে। তবে জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টিকে শুধু ভূখণ্ড হিসেবে দেখেন না। তার মতে, এটি লাখ লাখ মানুষের জীবন, পরিচয় এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
তিনি বলেন, কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া মানে সেখানে বসবাসকারী মানুষদের পরিত্যাগ করা। এটি ইউক্রেনের সামাজিক ঐক্যকে দুর্বল করে দেবে এবং দেশকে বিভক্ত করে ফেলতে পারে। এই কারণে তিনি এমন কোনো আপস করতে চান না, যা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও জানিয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রকৃত অর্থে অর্থবহ আলোচনা এবং আপোসের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সেই আপোস কখনোই স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে হবে না।
বিবিসির পক্ষ থেকে তাকে প্রশ্ন করা হয়, যদি কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিলে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়, তাহলে সেটি কি একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে? জবাবে জেলেনস্কি বলেন, এমন কোনো সমাধান হয়তো পুতিনকে সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট করতে পারে, কারণ তার কিছু সময়ের জন্য বিরতি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এর পর কী হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পুতিন বিরতির পর আবারও যুদ্ধ শুরু করতে পারেন।
জেলেনস্কি মনে করেন, পুতিনকে এখনই থামানো না গেলে তিনি ইউক্রেনের বাইরেও অন্য অঞ্চলে আগ্রাসন চালাতে পারেন। তার মতে, এটি শুধু ইউক্রেনের লড়াই নয়, বরং গোটা বিশ্বের স্বাধীনতা এবং স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আজ যদি পুতিনকে থামানো যায়, তাহলে সেটি শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় বিজয় হবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনার শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
পশ্চিমা কূটনৈতিক মহলে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে যে, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড ছাড় দিতে হতে পারে। তবে এই ধরনের প্রস্তাব ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত।
জেলেনস্কি বারবার বলেছেন, তার কাছে বিজয়ের অর্থ শুধুমাত্র সামরিক সাফল্য নয়, বরং দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা এবং রক্তপাত বন্ধ করা। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রকৃত সমাপ্তি তখনই হবে, যখন ইউক্রেনের মানুষ নিরাপদে এবং স্বাধীনভাবে তাদের জীবনযাপন করতে পারবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাশিয়া তাদের দাবির মাধ্যমে এক ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ চালাচ্ছে, যা শুধু ইউক্রেন নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
বিশ্লেষকদের মতে, জেলেনস্কির এই মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। প্রতিদিনের বোমা হামলা, ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে জেলেনস্কির বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং এটি একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের প্রতিফলন। তার কণ্ঠে যেমন দৃঢ়তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের বেদনা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার প্রতিধ্বনি।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এই সংঘাতের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, সামরিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।