প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল তার নির্বাচনী এলাকা জামালপুর-৩–এর জনগণকে নিয়ে ন্যায়, ইনসাফ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ভোট দিয়েছেন কি দেননি—এটি বিবেচনার বিষয় নয়; নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এলাকার প্রতিটি মানুষই তার সমান দায়িত্ব ও অগ্রাধিকারের অংশ। তার এই বক্তব্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি নির্বাচনের পর ঐক্যের বার্তা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষ্য।
সোমবার সন্ধ্যায় মেলান্দহ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাটি ছিল নবনির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। উপস্থিতদের মতে, দীর্ঘদিন পর এমন একটি উন্মুক্ত মতবিনিময় আয়োজন স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে।
বক্তৃতায় এমপি বাবুল বলেন, রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণে না আসে, তবে তার কোনো মূল্য নেই। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করে উন্নয়নকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। তার ভাষায়, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন তা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে। তিনি আরও বলেন, দলীয় পরিচয় নয়, মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই হবে তার কাজের মূল লক্ষ্য। তিনি কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক হিসেবেও পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নকে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল আরা। তিনি বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। সভায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা আক্তার জ্যোতি এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উবায়দুর রহমান স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন। তারা জানান, জনসেবাকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে প্রশাসন ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এবং জনপ্রতিনিধির সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হবে।
এই মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং গণঅধিকার পরিষদ–এর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উল্লেখযোগ্য। তাদের উপস্থিতি সভাটিকে একটি বহুদলীয় আলোচনার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। বক্তারা বলেন, স্থানীয় উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি। তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন এমপি সকল পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে এলাকায় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
সভায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের বক্তব্যে উঠে আসে এলাকার বাস্তব চিত্র। কেউ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দাবি করেন, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন চান, আবার কেউ স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর কথা বলেন। স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধি জানান, কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। এসব দাবি মনোযোগ দিয়ে শোনার পর এমপি বাবুল বলেন, জনগণের সমস্যা ও প্রত্যাশাই তার উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও কর্মসংস্থানের সংকটে অনেক তরুণ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তারা আশা করছেন, নতুন প্রতিনিধি কার্যকর উদ্যোগ নিলে এলাকায় শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। এমপি বাবুল তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্য স্থানীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দেয়। কারণ বাংলাদেশে প্রায়ই নির্বাচনের পর দলীয় বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেখা যায়। কিন্তু যদি একজন জনপ্রতিনিধি শুরু থেকেই সবাইকে নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন, তাহলে তা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
সভা শুরুর আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নবনির্বাচিত এমপিকে ফুলের তোড়া ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়, যা ছিল তার প্রতি স্থানীয় প্রশাসনের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রতীক। অনুষ্ঠানের শেষাংশে দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত অতিথিদের জন্য ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এই আয়োজন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মাদারগঞ্জ এলাকার কয়েকজন প্রবীণ নাগরিক বলেন, তারা বহু নির্বাচিত প্রতিনিধির বক্তব্য শুনেছেন, কিন্তু বাস্তবে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থাকা, সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এমপি বাবুল এ প্রসঙ্গে বলেন, তিনি নিয়মিত এলাকায় অবস্থান করে মানুষের কথা শুনবেন এবং প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বজায় রাখবেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের সভা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এখানেই জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে বসে সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে পারে। তারা মনে করেন, যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে।
সব মিলিয়ে নবনির্বাচিত এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের বক্তব্য ও উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার সঞ্চার করেছে। এখন দেখার বিষয়, তার ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং সেই পদক্ষেপ কতটা দ্রুত মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলে মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।