এল মেনচোর মৃত্যুতে মেক্সিকো জুড়ে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬ বার
মেক্সিকোয় শীর্ষ মাদকসম্রাটের মৃত্যুতে সহিংসতা

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মেক্সিকোর অপরাধজগতের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়ের অবসান হলেও দেশটি এখন দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি গভীর সংকটের মুখে। কুখ্যাত মাদকসম্রাট নেমেসিও অসিগুয়েরা সাভাতেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামেই বেশি পরিচিত, তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মেক্সিকো কার্যত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো অঙ্গরাজ্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্যে। চলমান এই সহিংসতায় মেক্সিকোর ন্যাশনাল গার্ডের অন্তত ২৫ জন সদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার জালিস্কোর তাপালপা শহরে এল মেনচোকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায় মেক্সিকোর সেনাবাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা এই মাদকসম্রাটকে আটক করতে অভিযানটি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় ও কৌশলগত। অভিযানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তার অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর তীব্র সংঘর্ষ হয়। পরে তাকে রাজধানী মেক্সিকো সিটি–তে নেওয়ার পথে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত অবস্থায় পথেই তার মৃত্যু হয়।

এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর অপরাধজগতের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হলেও তার প্রভাব পড়েছে ঠিক উল্টো পথে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন শহরে অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ, সরকারি ভবনে হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। জালিস্কো ছাড়াও মিচোআকান, গুয়ানাহুয়াতো, নায়ারিত ও সিনালোয়া অঙ্গরাজ্যে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, একাধিক স্থানে ভারী অস্ত্র নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

এল মেনচো ছিলেন মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী অপরাধচক্র জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের শীর্ষ নেতা। তার নেতৃত্বে এই কার্টেল দেশটির মাদক পাচার, অস্ত্র ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার মৃত্যু অপরাধচক্রের নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তার অনুসারীরা এটিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে দেখছে।

মেক্সিকোর ন্যাশনাল গার্ডের ২৫ জন সদস্যের প্রাণহানি দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এক বড় ধাক্কা। নিহতদের বেশিরভাগই পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সড়ক অবরোধ সরাতে গিয়ে হামলার শিকার হন, আবার কেউ সশস্ত্র সংঘর্ষে নিহত হন। এই ঘটনায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও বিরাজ করছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেয়। মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিকার্ডো ট্রেভিলা এক বিবৃতিতে জানান, শুধুমাত্র পশ্চিমাঞ্চলেই অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার থেকে সারা দেশে মোট ৯ হাজার ৫০০ সেনা ও নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। তার ভাষায়, “রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আমরা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করব।”

সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। বহু এলাকায় স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, গণপরিবহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে কিছু অঞ্চলে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়েছে। সাধারণ নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছেন, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর মাদকবিরোধী যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একদিকে এটি সরকারের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণের প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে শক্তিশালী কার্টেল নেতাদের অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা আরও বেড়ে যেতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় কোনো মাদকসম্রাট নিহত বা গ্রেপ্তার হলে তার অনুসারীদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই পরিস্থিতি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, সহিংসতা দমনের নামে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়েও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

মেক্সিকো সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সহিংসতা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং এল মেনচোর মৃত্যুর পর সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা কীভাবে সামাল দেওয়া যায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ নয়, দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া মাদকচক্রের প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

এল মেনচোর মৃত্যু হয়তো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সহিংসতার উত্তরাধিকার এখন মেক্সিকোর জন্য এক কঠিন বাস্তবতা। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলার লড়াই—এই তিনটি চ্যালেঞ্জই এখন মেক্সিকোর সামনে সমানভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ই বলে দেবে, এই সংকট থেকে দেশটি কত দ্রুত এবং কীভাবে বেরিয়ে আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত