প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এবং মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার–এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৫টি শহরের মধ্যে ঢাকার বায়ুদূষণের মান ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই মানের সাথে তুলনা করলে ভারতীয় রাজধানী দিল্লি প্রথম স্থানে অবস্থান করছে ২৫২ একিউআই স্কোর নিয়ে, যা নাগরিকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। পাকিস্তানের লাহোর শহর ২৩৪ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয়, আর ঢাকার অবস্থান ২১৭ স্কোরসহ তৃতীয় স্থানে। মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন চার নম্বরে অবস্থান করছে ২০৪ স্কোরসহ।
বায়ুমান মান (একিউআই) শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত ‘ভালো’, ৫১ থেকে ১০০ ‘মাঝারি’, ১০১ থেকে ১৫০ ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’, ১৫১ থেকে ২০০ ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’, এবং ৩০১ থেকে ৪০০ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকার ২১৭ স্কোর এই মুহূর্তে নাগরিকদের জন্য উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, হৃদরোগ বা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য।
ঢাকার বায়ুদূষণ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শ্বাসনালী, ফুসফুস, হৃদযন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাবসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শহরের যানবাহন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নির্মাণ কাজ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বায়ুদূষণের মূল কারণ। রাজধানীর ট্রাফিক জ্যাম এবং প্রায়শই অপর্যাপ্ত পরিবেশবান্ধব নীতিমালা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
শহরের আকাশে ধূলো এবং ক্ষতিকর বায়ু কণার উপস্থিতি চোখে দেখা যায় না, তবে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে তা সহজেই শরীরে প্রবেশ করে। ডাক্তারা জানাচ্ছেন, আজকের মতো ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ দিনের সময় বাইরে হাঁটাহাঁটি, দৌড়ঝাঁপ, বাইসাইকেল চালানো বা অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকা উচিত। শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, রাজধানীর বায়ুদূষণ কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তারা উল্লেখ করছেন, যানবাহনের ধোঁয়া কমাতে পুরনো যানবাহন প্রতিস্থাপন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং শিল্প স্থাপনার মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া, নাগরিক সচেতনতা ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত পরিবীক্ষণও অতি গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার বাতাসের এই ভয়াবহ অবস্থার প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নাগরিকদের ঘরের ভিতরে থাকার পাশাপাশি, সম্ভাব্য হলে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার এবং বাইরে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব মানুষ ফুসফুস বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি জীবন রক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শহরের দৈনন্দিন জীবনেও এ বায়ুদূষণ প্রভাব ফেলছে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। অফিসে কাজ করা মানুষও বাইরে চলাচল ও যানবাহনে সময় কাটাতে গিয়ে বিপদে পড়ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রভাবিত হচ্ছে, কারণ কর্মজীবীরা অসুস্থতার কারণে দফতরে হাজির হতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঢাকার এই বায়ুদূষণের খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এশিয়ার অন্যান্য দূষিত শহরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ঢাকা ধীরে ধীরে শীর্ষস্থানীয় দূষিত শহরের তালিকায় নিজেকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে শহরটি দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে।
অধিকাংশ নাগরিক এখন সরকারের কাছে সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন। পরিবহন খাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, শিল্পায়নের মান নিয়ন্ত্রণ, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং বায়ু মান পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন নীতি প্রয়োজন। নগরবাসীর জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, মাস্ক ব্যবহার, শিশু ও বয়স্কদের বাড়িতে রাখা, এবং আউটডোর কার্যক্রম সীমিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকার বায়ুদূষণ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই তৈরি করছে না, বরং এটি শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন সময় এসেছে নীতি প্রণয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার। সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে নাগরিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার এই ভয়াবহ বায়ুদূষণ শুধু স্থানীয় সমস্যাই নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য-পরিবেশ সংকেত হিসেবে কাজ করছে। নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এখন তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক রূপ নেয় না।