শোকজের জবাব অসন্তোষজনক হলে শাস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
বাংলাদেশ ব্যাংক শোকজ নোটিশ

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের আগামী ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

মঙ্গলবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি শোকজের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, যেসব কর্মকর্তার নাম সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তারাই শোকজের তালিকায় রয়েছেন এবং তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ যাচাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

শোকজ করা তিন কর্মকর্তা হলেন এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক ও নীল দলের সাধারণ সম্পাদক নওশাদ মোস্তফা, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ। জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা বক্তব্য দেন এবং সেখানে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। তাদের বক্তব্যে ব্যাংক খাতের নীতি, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া, ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন, সভা, সেমিনার বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে বাধ্য। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ নিয়ম অনুযায়ী প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ উত্থাপন করার সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপটে কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা ভঙ্গ করেছেন কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, তুলনামূলকভাবে কম দুর্বল ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত এক্সিম ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক-কে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা প্রশ্নবিদ্ধ। তারা আরও অভিযোগ করেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দেওয়া নথি অনুযায়ী, ওই সময় অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স মূল্যায়নসহ আটটি নির্ধারিত এজেন্ডার ভিত্তিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে গভর্নরের ‘খেয়ালিপূর্ণ’ বক্তব্য বন্ধ করতে হবে এবং ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়াকে বস্তুনিষ্ঠ ও নীতিনির্ভর করতে হবে। সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন চান, তবে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান যেন একনায়কতান্ত্রিক আচরণ না করেন, সেটি নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য।

এই অভিযোগের জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, গভর্নর বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যেই উত্থাপন করার বিধান রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করাকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে কর্মকর্তারা তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কথা বলেছেন। তাদের মতে, অতীতে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠলেও তখন তারা প্রকাশ্যে কথা বলেননি। এখন যদি তারাও নীরব থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাদেরও জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। নওশাদ মোস্তফা বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটলে হয়তো তারা এতটা খোলামেলা বক্তব্য দিতে পারতেন না।

ঘটনার পেছনে আরেকটি প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে সম্প্রতি একটি সর্বদলীয় ঐক্য গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নীল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন অভ্যন্তরীণ গ্রুপ থেকে প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই উদ্যোগের সমন্বয়ক করা হয়েছে নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউ-এর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরী-কে। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদ সম্মেলনে তাকে উপস্থিত দেখা যায়নি, যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মহলে নানা আলোচনা চলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে কর্মকর্তাদের মতামত দেওয়ার অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নীতিমালাও বজায় রাখতে হয়। এই ধরনের ঘটনা যদি সঠিকভাবে সমাধান না করা হয়, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। এমন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসা নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

একই সঙ্গে এই ঘটনাকে অনেকেই বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, কর্মকর্তাদের অভিযোগ যদি বাস্তবভিত্তিক হয়, তবে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। আর যদি নিয়ম ভঙ্গ হয়ে থাকে, তবে শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।

বর্তমানে নজর রয়েছে শোকজ নোটিশের জবাবের দিকে। আগামী দশ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেবেন। সেই জবাব বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। প্রশাসনিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত শুধু সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা প্রয়োগের দৃষ্টান্ত হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বোপরি, ঘটনাটি দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ব্যাখ্যা পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা ব্যাংক খাতের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কী প্রভাব ফেলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত