বিক্ষোভ চলবে, ‘লাল রেখা’ মানতে হবে: ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
ইরান শিক্ষার্থী বিক্ষোভ সতর্কতা

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভকে ঘিরে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানিয়েছে ইরান সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার স্বীকার করলেও সরকার স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে—রাষ্ট্র নির্ধারিত কিছু ‘লাল রেখা’ কোনো অবস্থাতেই অতিক্রম করা যাবে না। সপ্তাহান্ত থেকে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে পুনরায় বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর মঙ্গলবার এই প্রথম সরকারিভাবে এমন প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি কৌশলগত বার্তা।

সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক বিবৃতিতে বলেন, পবিত্র ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় পতাকা রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতীক, যেগুলোকে রক্ষা করা নাগরিকদের দায়িত্ব। তার ভাষায়, “এই বিষয়গুলো আমাদের লাল রেখা। ক্ষোভ বা উত্তেজনা যতই তীব্র হোক না কেন, এগুলো অতিক্রম করা যাবে না।” তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সরকার একদিকে মতপ্রকাশের অধিকার স্বীকার করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সীমারেখা বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক নীতির নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, তাদের মতামত ও দাবি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এসব দাবি নিয়ে গত কয়েক দিনে কয়েকটি বড় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে, যদিও বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ভাষ্যটি দ্বৈত বার্তা বহন করে। প্রথমত, এটি আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে চায় যে সরকার শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অধিকার অস্বীকার করছে না। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণভাবে এটি একটি সতর্ক সংকেত—যে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে তা অতিক্রম করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই ধরনের কৌশল সাধারণত তখনই দেখা যায় যখন সরকার জনমতকে পুরোপুরি দমন না করে নিয়ন্ত্রিত পরিসরে রাখতে চায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থী আন্দোলন বহু দেশে সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে এবং ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পেছনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল। ইরানের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হলে তা দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় পরিণত হয়।

সরকারি সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তারা মনে করছে, সংলাপ ও ধৈর্যের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে তারা শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা নিজেদের দাবি উপস্থাপন করলেও রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান বজায় রাখে।

মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অংশ, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের সময় রাষ্ট্রীয় আইনের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হয়। এই ভারসাম্য বজায় রাখাই যেকোনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে নজর রাখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও। তাদের ধারণা, সরকার যে ভাষা ব্যবহার করেছে তা সরাসরি দমনমূলক নয়, বরং সতর্কতামূলক। এটি পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে আনার কূটনৈতিক ভাষা হতে পারে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী আন্দোলন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করা ইতিবাচক বার্তা, তবে ‘লাল রেখা’ শব্দবন্ধের ব্যাখ্যা স্পষ্ট না হলে ভবিষ্যতে তা বিতর্ক তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, কোন কাজ সীমালঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নির্দেশনা থাকা জরুরি।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ সমাজ সাধারণত পরিবর্তনের প্রতীক। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত চায়, দ্রুত সংস্কার চায় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। তাই তাদের আন্দোলনকে কেবল নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সামাজিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংলাপভিত্তিক সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।

ইরানের সাম্প্রতিক বিবৃতি সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এতে যেমন কঠোরতার ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি রয়েছে নমনীয়তার বার্তা। একদিকে সরকার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণভাবে নীরব থাকার নির্দেশ দেয়নি। ফলে রাজনৈতিকভাবে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিস্থিতি এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সংলাপের ওপর। যদি উভয় পক্ষ সংযম বজায় রাখে, তবে উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে। আর যদি ভুল বোঝাবুঝি বা অতিরিক্ত কঠোরতা দেখা দেয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ঐতিহাসিকভাবে মতবিনিময় ও চিন্তার স্বাধীনতার স্থান হিসেবে পরিচিত। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে ছাত্র রাজনীতি, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, সরকারের বক্তব্যে যে সতর্কতা ও স্বীকৃতির মিশ্রণ দেখা গেছে, তা পরিস্থিতিকে আপাতত স্থিতিশীল রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন নজর রয়েছে—এই ঘোষণার পর মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি কতটা শান্ত থাকে এবং সংলাপের পথ কতটা উন্মুক্ত হয় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত