ইউনুছের জামিনে বিক্ষোভ, আইনজীবী সমিতির আদালত বর্জন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
ইউনুছের জামিনে বিক্ষোভ, আদালত বর্জন

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরিশাল নগরীর আদালতপাড়ায় মঙ্গলবার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এক জামিন আদেশকে কেন্দ্র করে। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকের অপসারণ দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে আলোচিত একটি মামলায় জামিন প্রদান বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিক্ষোভকারীদের কেন্দ্রীয় দাবি ছিল বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুছকে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার জেলা ও মহানগর বিএনপি কার্যালয়ে ভাঙচুর ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে জামিন দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই আদালত চত্বরে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কয়েকজন আইনজীবী অভিযোগ করেন, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাদের জামিন দেওয়া বিচারিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মামলা সংক্রান্ত অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদালতের উচিত ছিল আরও সতর্কতা অবলম্বন করা। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিষয়টি শুধুমাত্র একটি মামলার আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।

বিক্ষোভ চলাকালে অংশগ্রহণকারী আইনজীবীদের একটি অংশ বিচারককে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে অভিযোগ করেন এবং স্লোগান দিতে থাকেন। তারা দাবি করেন, বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট বিচারককে অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। বক্তারা আরও বলেন, বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তার দায়ভার রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।

আইনজীবী সমিতির নেতারা ঘোষণা দেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আদালতের কার্যক্রম বর্জন করবেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে আদালতে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক মানুষ দিনভর অপেক্ষা করেও তাদের মামলার শুনানি করতে পারেননি। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বিচারপ্রার্থীরা যেন শাস্তি পাচ্ছেন।

বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাদিকুর রহমান লিংকন। বক্তব্য দেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ পান্না, জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসীন মন্টু, সমিতির সম্পাদক মীর্জা রিয়াজ হোসেন এবং সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ইমনসহ অন্যরা। বক্তারা বলেন, বিচার বিভাগে যদি কোনো সিদ্ধান্ত বিতর্ক সৃষ্টি করে, তাহলে তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা উচিত। তারা মনে করেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

এদিকে অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতা তালুকদার মো. ইউনুছের সমর্থকদের দাবি, আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং এটি বিচারকের স্বাধীন এখতিয়ার। তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপে আদালতের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়। তারা বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং আইনের পথেই সব বিষয় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।

ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলও। আইনজীবীদের একাংশ যারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-পন্থি হিসেবে পরিচিত, তারা এই জামিন আদেশের তীব্র প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে অভিযুক্ত নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হলে তা সামাজিক উত্তেজনাও বাড়াতে পারে।

বিক্ষোভ চলাকালে কিছু আইনজীবী স্লোগানে উল্লেখ করেন যে বিচারক একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার আত্মীয়। তারা নাম উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের-এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলেন। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামিন দেওয়া বা না দেওয়া আদালতের এখতিয়ারভুক্ত একটি স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো সিদ্ধান্ত যদি জনমনে প্রশ্ন তোলে, তখন বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা মনে করেন, আদালতের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বিচার ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।

মানবাধিকার বিশ্লেষকরাও ঘটনাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, বিচার বিভাগের ওপর জনআস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে একদিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সাংবিধানিক অধিকারও সম্মান করতে হবে। তবে সেই প্রতিবাদ যেন বিচার কার্যক্রম স্থবির না করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। আদালত চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনা দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তাহলে আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে পারে। তাই তারা মনে করেন, সংলাপ, আইনি ব্যাখ্যা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নজর রয়েছে আইনজীবীদের ঘোষিত কর্মসূচির দিকে। তারা যদি আদালত বর্জন অব্যাহত রাখেন, তাহলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ যদি অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা ব্যাখ্যা দেয়, তবে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সব মিলিয়ে, একটি জামিন আদেশ ঘিরে বরিশালের আদালতপাড়ায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি স্থানীয় ঘটনার সীমায় নেই; বরং এটি বিচার বিভাগ, রাজনীতি এবং নাগরিক আস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত