ইরানের ফল বাজারে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
ইরান হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা বাজার

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান–এর মধ্যাঞ্চলে একটি সামরিক হেলিকপ্টার ফলের বাজারে বিধ্বস্ত হয়ে চারজনের প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে দুর্ঘটনাটি ঘটে ইসফাহান প্রদেশ–এর অন্তর্গত দর্চে শহরে, যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাবেচার ব্যস্ততার মাঝেই আকাশ থেকে নেমে আসে এই মর্মান্তিক বিপর্যয়।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ বা রুটিন উড্ডয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে হেলিকপ্টারটি উড়ছিল। হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে সেটি দ্রুত নিচে নেমে এসে একটি ফলের বাজারের ওপর আছড়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে, স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে শান্ত সকালটি রূপ নেয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে।

দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের মধ্যে রয়েছেন হেলিকপ্টারের পাইলট ও সহপাইলট এবং বাজারে উপস্থিত দুই ব্যবসায়ী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হেলিকপ্টারটি নিচে নামার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছিল এবং সেটি স্থিরভাবে উড়তে পারছিল না। একজন দোকানি বলেন, আকাশে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় সেটি দুলছিল, তারপর আচমকা নিচে পড়ে বিস্ফোরিত হয়।

দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি সেবা কর্মী ও দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন এলাকা ঘিরে ফেলে এবং তদন্ত শুরু করে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে প্রযুক্তিগত ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, যদিও নিহতের সংখ্যা চারজনেই স্থির রয়েছে। নিহত ব্যবসায়ীদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে এবং তাদের পরিবারকে ইতোমধ্যে খবর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা কোনো দেশের জন্যই অস্বাভাবিক নয়, তবে জনবহুল এলাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটলে তা জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে বাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে সামরিক উড্ডয়ন রুট থাকা উচিত কি না, সে বিষয়েও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে সামরিক বাহিনীকে উড্ডয়নপথ পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।

এই দুর্ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের হামাদান প্রদেশ–এ দেশটির নিয়মিত বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল, যেখানে একজন পাইলট নিহত হন। পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনা দেশটির সামরিক উড়োজাহাজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। যদিও সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ আলাদা এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক দেশের মতো ইরানও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের পুরোনো ও আধুনিক উড়োজাহাজ একসঙ্গে ব্যবহার করে। পুরোনো প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও উল্লেখ করেন যে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, ব্ল্যাক বক্স ডেটা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দুর্ঘটনার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও প্রশাসন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে। বাজার এলাকা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকা তল্লাশি চালায় যাতে কোনো বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক সামরিক সরঞ্জাম ছড়িয়ে না থাকে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে দোকানপাট খুলতে শুরু করেন, যদিও দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনো তাদের মনে তাজা।

মানবিক দিক থেকে ঘটনাটি স্থানীয় সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিহত ব্যবসায়ীদের পরিবার হঠাৎ করে উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রতিবেশীরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকবার্তার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি উঠেছে।

সরকারি সূত্র বলছে, সামরিক উড্ডয়ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হয়। তবুও অপ্রত্যাশিত যান্ত্রিক ত্রুটি বা মানবিক ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনা কেবল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার বিষয় নয়, বরং জনআস্থা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। যখন সামরিক যানবাহন জনবহুল এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই স্বচ্ছ তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সবশেষে বলা যায়, দর্চের ফল বাজারে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা একটি স্থানীয় দুর্ঘটনা হলেও এর প্রতিক্রিয়া জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, সামরিক উড্ডয়ন নীতি এবং জননিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশের পরই বোঝা যাবে ঠিক কী কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত