সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি শুরু মার্চে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দিতে সরকার নতুন উদ্যোগ হিসেবে “ফ্যামিলি কার্ড” কার্যক্রম সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে দেশের ১৪টি উপজেলায় একযোগে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে তা সারাদেশে বিস্তৃত করা হবে। মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়–এ অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন আগামী ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করবেন তারেক রহমান, যাকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও সরকারিভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত সূচি বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তখনো প্রকাশিত হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে প্রশাসনিক পর্যায়ে শুরু হয়েছে।

সভা শেষে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, সমাজের হতদরিদ্র, দরিদ্র এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত—এই তিন শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার ভাষ্যমতে, নির্বাচিত উপকারভোগীরা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। এই অর্থ সরাসরি পরিবারের কাছে পৌঁছাবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে। তিনি দাবি করেন, এই সহায়তা বিশেষভাবে নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে এবং পরিবারে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা জোরদার করবে।

বৈঠকটি ছিল ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে গঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপকমিটির আলোচনার অংশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্মসূচিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই, তথ্যভান্ডার প্রস্তুত এবং উপকারভোগী তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। সরকারি সূত্র বলছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা সম্প্রসারণে এই প্রকল্পকে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি উপজেলায় চালু করে পরে সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সমাধান করা যায়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ বা তালিকা প্রস্তুতের কাজে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। তিনি জানান, প্রতিটি উপজেলায় সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি প্রশাসনিক দল গঠন করা হবে এবং তারা তথ্য যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করবে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে উপকারভোগীদের তথ্য অন্তত দুইবার পুনরায় যাচাই করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, এই বহুস্তর যাচাই প্রক্রিয়া দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে কার্যকর হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে কাজ করা গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও উপকারভোগী শনাক্তকরণ এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। তারা মনে করেন, যদি তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল ডাটাবেস ব্যবহার করে প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে নতুন এই উদ্যোগটি কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ে, তাহলে লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।

নীতিনির্ধারক মহল বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা অনেক সময় সরকারি সহায়তার আওতার বাইরে থাকে, তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা চালু করা এখন সময়ের দাবি। ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প সেই চাহিদা পূরণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য নিয়মিত সামান্য সহায়তাও বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থ দিয়ে পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, চিকিৎসা ব্যয় মেটানো কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একটি ক্ষুদ্র সহায়তাও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এর সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ যুক্ত করা গেলে প্রকল্পের প্রভাব আরও টেকসই হবে। তাদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে শুধু ভাতা বিতরণে সীমাবদ্ধ না রেখে তা যেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সফল হলে এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটলে ভবিষ্যতে অন্যান্য ভাতা কর্মসূচিও একই প্ল্যাটফর্মে আনা সম্ভব হবে। এতে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং স্বচ্ছতাও বাড়বে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্চ মাসে পরীক্ষামূলক সূচনার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির যাত্রা শুরু হলে তা দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রশাসনিক তদারকির ওপর। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি ঘোষিত নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে পারে, তাহলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত