ক্যারিবিয়ানে মার্কিন হামলা নিয়ে বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
ক্যারিবিয়ান সাগরে মার্কিন হামলা

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদক চোরাচালান দমনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় ক্যারিবিয়ান সাগর–এ একটি নৌযানে হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড। সোমবার পরিচালিত ওই অভিযানের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে সংস্থাটি দাবি করেছে, লক্ষ্যবস্তু নৌযানটি মাদক পাচার কার্যক্রমে জড়িত ছিল এবং তা একটি পরিচিত পাচার রুটে চলাচল করছিল।

মার্কিন সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে নৌযানটি বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজেও একটি ছোট নৌযানে বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পরপরই জরুরি উদ্ধার তৎপরতার কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, ফলে নিহতদের পরিচয় ও জাতীয়তা নিয়েও এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদক চোরাচালানবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সর্বশেষ হামলাসহ এই অভিযানে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৫০ জনে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও নিহতদের পরিচয়, তারা প্রকৃতপক্ষে পাচারকারী ছিলেন কি না কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর প্রশাসন ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলে সক্রিয় “মাদক-সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক” ধ্বংসে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাদের মতে, এসব নৌযান আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের অংশ এবং এগুলো ধ্বংস করা আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা যুক্তি দিচ্ছেন, মাদক পাচারকারীরা শুধু অপরাধচক্র নয়, বরং তারা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সহিংস সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।

তবে এই যুক্তি আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় কোনো নৌযান ধ্বংস করার আগে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সতর্কবার্তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদের মতে, যদি লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি না করে থাকে, তাহলে এমন হামলা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের নতুন নজির তৈরি করতে পারে, যা অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। একই সময় তারা আঞ্চলিক রাজনীতিতেও সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা–এর পরিস্থিতি নিয়ে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন জাহাজ জব্দ এবং অপরাধচক্রের অর্থায়ন বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমনকি দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো–কে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে রাজধানীতে অভিযান চালানোর কথাও তারা উল্লেখ করেছে, যদিও সে বিষয়ে স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলও কাজ করতে পারে। তারা বলছেন, ক্যারিবীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে পরিচিত, ফলে এখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে সমালোচকদের মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে আঞ্চলিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ দমন করলে তা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।

ঘটনাটির মানবিক দিকও আলোচনায় এসেছে। নিহতদের পরিচয় প্রকাশ না হওয়ায় তাদের পরিবার বা স্বজনদের অবস্থাও অজানা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যেকোনো অভিযানে প্রাণহানি ঘটলে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত, তদন্ত পরিচালনা এবং দায় নির্ধারণ করা আন্তর্জাতিক নীতিমালার অংশ হওয়া উচিত। তারা দাবি করছে, এই হামলার ঘটনাটিও একটি স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এদিকে আঞ্চলিক কয়েকটি দেশ কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। যদিও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবু কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক হামলার নজির ভবিষ্যতে সমুদ্র নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক আইন সংস্কার বা নতুন নির্দেশিকা তৈরির দাবি জোরালো হতে পারে।

সব মিলিয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক এই হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযানের ঘটনা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য—এই তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ও সমালোচকদের অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ থাকায় বিষয়টি নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে আলোচনা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে এমন অভিযান অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এর বৈধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত