সংসদে হুইপের ভূমিকা কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
সংসদে হুইপের কাজ কী

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি আগামী ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন, যা নতুন সংসদের কার্যক্রম শুরু করার সাংবিধানিক ধাপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে অধিবেশন শুরুর আগে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদ শূন্য থাকা, আগের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবন্দি অবস্থার কারণে প্রথম বৈঠক কে পরিচালনা করবেন তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুতই সংসদীয় কাঠামো গঠনের তৎপরতা শুরু হয়। সেই দিনই বিএনপি জোট তাদের সংসদীয় বৈঠকে তারেক রহমান–কে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে। একই দিনে বিরোধী জোটের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী–এর আমির শফিকুর রহমান–কে বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপি–এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম–কে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করা হয়। এর মাধ্যমে সংসদের ক্ষমতার ভারসাম্য ও আনুষ্ঠানিক বিরোধী কাঠামোও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সরকারি ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই অধিবেশন বসবে এবং ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হবে। একই অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যা নতুন সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা নির্দেশ করে।

সাংবিধানিক প্রথা অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আগের সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পদ দুটি কার্যত শূন্য থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম বৈঠকের সভাপতিত্ব কে করবেন। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে অস্থায়ী সভাপতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে অথবা প্রবীণ সদস্যদের মধ্য থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

সংসদীয় কাঠামোর আলোচনায় নতুন করে সামনে এসেছে সরকারি ও বিরোধী দলীয় হুইপ পদ নিয়ে আগ্রহ। সাধারণ নাগরিকদের কাছে পদটি তুলনামূলক কম পরিচিত হলেও সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংসদ বিষয়ক গবেষকরা। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পর রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে প্রভাবশালী পদগুলোর একটি হলো চিফ হুইপ। সরকারি দলের চিফ হুইপকে সংসদে দলের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি সংসদের ভেতরে দলীয় অবস্থান তুলে ধরেন এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সদস্যদের উপস্থিতি ও ভোট নিশ্চিত করেন।

হুইপের মূল দায়িত্ব সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কোনো বিল বা প্রস্তাব উত্থাপিত হলে দলের সদস্যরা যাতে নির্ধারিত অবস্থান অনুযায়ী ভোট দেন, তা নিশ্চিত করাও তাদের কাজের অংশ। পাশাপাশি সংসদীয় আলোচনায় কে কখন কথা বলবেন, কত সময় বক্তব্য দেবেন এবং কোন ইস্যুতে দলীয় অবস্থান কী হবে—এসব বিষয়েও হুইপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংসদ বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর হুইপ না থাকলে সংসদে দলীয় সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের দায়িত্বও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি বিরোধী দলের কৌশল নির্ধারণ, সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিরোধী সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ভূমিকা রাখেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এ কারণেই সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের হুইপ পদকে সংসদের কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয়।

আইন অনুযায়ী চিফ হুইপ এবং বিরোধীদলীয় নেতার পদমর্যাদা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান। ফলে তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও প্রটোকল পান, যা সংসদীয় মর্যাদা ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়ক বলে ধরা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মর্যাদা শুধু সম্মানসূচক নয়; বরং সংসদের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার সাংবিধানিক স্বীকৃতি।

নতুন সংসদে সরকার দলীয় চিফ হুইপ ও উপনেতা পদ এখনো ঘোষণা না হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে কিছুটা কৌতূহল রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হলে সংসদ পরিচালনায় প্রশাসনিক সমন্বয় আরও সহজ হবে। তবে দলীয় অভ্যন্তরীণ আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিবেশও ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হচ্ছে। নতুন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া জোট সরকার তাদের আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী জোট নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সংসদে হুইপদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, কারণ তারাই মূলত সংসদের ভেতরে দলীয় কৌশল বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দেন।

সব মিলিয়ে নতুন জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুধু আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান এবং হুইপদের সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে সংসদের প্রাথমিক অধিবেশন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত