প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র মাহে রমজান শুধু ধর্মীয় পালন নয়, এটি আমাদের বাঙালিয়ানার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও গভীরভাবে প্রোথিত। বিশেষ করে সেহরির ডাক বা সাহরির আহ্বান এই জনপদের মুসলিম সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ঘুমের গভীর নীরবতা ভেঙে মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসা সেহরির আওয়াজ কেবল একটি ঘণিষ্ঠ সময়ের সঙ্কেত নয়, এটি হৃদয়ে বাজা এক অভিজ্ঞতার সুর, যা মুসলমানদের আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করে।
প্রতিটি রমজানেই বাঙালিয়ানার গ্রাম ও শহরের মানুষ ঘুম থেকে উঠে সেহরির জন্য প্রস্তুতি নেন। প্রিয় অঞ্চলের মানুষকে ঘুম ভেঙে দেওয়ার এই আহ্বান, “ঘুম থেকে উঠুন, সাহরি করুন, সেহরির আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি,” কেবল একটি সময়সূচি নয়, এটি আমাদের আত্মার সঙ্গে সংযোগের একটি সেতু। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ, সাইরেনের তীক্ষ্ণ ধ্বনি এবং ঘরের বাইরে সবার মিলিত প্রতিধ্বনি এক অপার্থিব সুরের সৃষ্টি করে, যা শুধু কানে নয়, হৃদয়ে বাজে। এই সুর আমাদের ধর্মচেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করে এবং একাগ্রতা, সংযম ও আত্মশুদ্ধির বার্তা পৌঁছে দেয়।
বাঙালিয়ানার মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই সাহরির দৃশ্য শতাব্দী ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে। এটি কেবল সময়ের অতিক্রম নয়, বরং একটি ঐতিহ্য, যা আমাদের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। এই দৃশ্যের মায়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার মাঝেও শান্তি ও আত্মবিশ্বাস জাগায়। অনিয়ম, অসংগতি ও অস্বচ্ছতার ভারে কখনো কখনো মানুষ ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও এই ধর্মপ্রাণ, সরল বিশ্বাসী পরিবেশ এবং রমজানের আধ্যাত্মিকতা যেন এক প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
রোজা পালন ও সেহরির সময় মানুষের জীবনে যে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ঘটে, তা শুধু শরীরের জন্য নয়, মন ও আত্মার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ছয়টি সিয়াম ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, এবং এখন সামনে কড়া নাড়ছে মাগফিরাতের দশক, যা আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তওবার মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি সুযোগ। এই সময়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মানসিক প্রস্তুতি ও আধ্যাত্মিক চর্চা মিলিয়ে মানুষ রোজার প্রকৃত মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারে।
সেহরির ঐতিহ্য শুধু আধ্যাত্মিক নয়, এটি বাঙালিয়ানার সামাজিক জীবনের এক অঙ্গও। সকালের অন্ধকারে উঠা, পরিবারের সঙ্গে একত্রে সাহরি করা, প্রতিবেশী ও সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা—সব মিলিয়ে একটি সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে। মসজিদের গজল, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ এবং আশপাশের মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই ঐতিহ্যকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বাঙালি মুসলিমরা এ সময় একদিকে যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন, অন্যদিকে সামাজিক দায়িত্ব পালনেও সচেষ্ট থাকেন। সততা, সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা ও সংযমের শিক্ষা এই সময় আরও দৃঢ়ভাবে আচার-ব্যবহারে প্রভাব ফেলে। সাহরির সুর কেবল এক নির্দিষ্ট সময়ের ডাক নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক দায়িত্বের বার্তা। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এক জীবন্ত সংস্কৃতির নিদর্শন।
এই মাহে রমজান আমাদের জীবনের বাঙালিয়ানার গভীরতম শিকড়ে ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলন ঘটায়। দেশের মানুষ ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক দায়িত্বকে একসাথে ধারণ করে চলেছেন। এই অভিজ্ঞতা, যা হাজার বছরের ঐতিহ্য হিসেবে প্রবাহিত, আমাদের অভ্যন্তরীণ আত্মা ও সমাজের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে। সাহরির আহ্বান, মুয়াজ্জিনের সুর, গৃহস্থের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অনুভূতি, যা বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির অংশ।
রমজানের প্রতিটি মুহূর্তে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তওবার মাধ্যমে নতুন জীবন ও মানসিক প্রশান্তি অর্জনের বার্তা লুকিয়ে আছে। এটি এক ধরনের আত্মিক পুনর্জাগরণ, যা আমাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেহরির এই সুর কেবল ঘুম ভাঙায় না, বরং মন ও হৃদয়কে আলোকিত করে, মুসলিম জীবনের সৌন্দর্য ও বাঙালিয়ানার সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের চেতনা সংযুক্ত করে।
যথাযথ আধ্যাত্মিক চর্চা, পরিবারের সঙ্গে একত্রে সময় কাটানো এবং সমাজে মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রমজান আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। এই মাসের মাহাত্ম্য আমাদের আত্মার উন্নতি, পরিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং সমাজে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার সুযোগ দেয়।
সাহরির ডাক, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ এবং ঘরের বাইরে উদ্দীপ্ত মানুষের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব চিত্র গড়ে তোলে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা প্রজন্মের পর প্রজন্মে সংরক্ষিত থাকে এবং রমজানের আসল মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। প্রতিটি মুসলমান এই সময় আত্মশুদ্ধি, সংযম, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে।
রমজানের এই মাহাত্ম্য ও সাহরির অনন্য সুর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মাটির ধর্মপ্রাণ সৌন্দর্য এবং মানুষের সরল বিশ্বাস আমাদের জীবনের মূল শক্তি। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাঙালিয়ানার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের অঙ্গ, যা আমাদের পরম শান্তি, সংযম ও মানবিকতা শিখায়। এই আবহে আত্মাকে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান লুকিয়ে আছে, যা আমাদের রমজানকে বিশেষ করে।