প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মানুষের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। প্রায় দুই মাস ধরে নিখোঁজ থাকা র্যাবিস ভ্যাকসিন কেনার বরাদ্দের অর্থের হদিস মিলেছে এবং অবশেষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ভিত্তিতে ৫০ ভায়াল র্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ও গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর প্রশাসনের তৎপরতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত তিন থেকে চার মাস ধরে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ র্যাবিস ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট চলছিল। কুকুরে কামড়ানো রোগীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী এই টিকা না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে জেলা শহর ঝিনাইদহ কিংবা পার্শ্ববর্তী যশোর জেলায় গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে উচ্চমূল্যে টিকা সংগ্রহ করেছেন। ফলে রোগীর পরিবারকে শুধু মানসিক চাপই নয়, অতিরিক্ত আর্থিক বোঝাও বহন করতে হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুকুরে কামড়ানোর মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ভ্যাকসিন দেওয়া না গেলে রোগীর জীবনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু টিকার অভাবে অনেক পরিবারকে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে বা দূরের শহরে ছুটতে হয়েছে। এতে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার আতঙ্কে অনেকেই ভেঙে পড়েছিলেন। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের জন্য এ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। তারা জানান, সরকারি হাসপাতালে টিকা না থাকলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দাম অনেক বেশি হওয়ায় চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে উপজেলা পরিষদ থেকে র্যাবিস ভ্যাকসিন কেনার জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অর্থ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও ভ্যাকসিন কেনা হয়নি এবং বরাদ্দ অর্থের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। বিষয়টি স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় দৈনিক আমার দেশ-এ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। সংবাদ প্রকাশের পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি বৈঠক করে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলস্বরূপ স্বল্প সময়ের মধ্যেই ৫০ ভায়াল র্যাবিস ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়, যা ইতোমধ্যে রোগীদের প্রয়োজনে ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, র্যাবিস একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত পশুর কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক টিকা না নিলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই কুকুর বা অন্য কোনো সন্দেহজনক প্রাণীর কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই টিকার বিকল্প নেই বললেই চলে। ফলে সরকারি হাসপাতালে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এই ঘটনাটি শুধু একটি হাসপাতালের প্রশাসনিক সমস্যার উদাহরণ নয়, বরং গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। তারা বলেন, বরাদ্দ অর্থ সময়মতো ব্যবহার হলে এতদিন রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। তাই ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি না ঘটে, সেজন্য নিয়মিত তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন করে সরবরাহ পাওয়া ভ্যাকসিন আপাতত জরুরি চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যাতে আর সংকট না তৈরি হয়, সে জন্য নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারের হিসাব ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, র্যাবিস প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। তারা বলছেন, মানুষকে সচেতন করতে হবে যাতে প্রাণীর কামড়ের পর অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যায়। পাশাপাশি পথকুকুর নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করলে রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এ ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও অনেকেই মনে করছেন, সমস্যা সমাধান হয়েছে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের নড়াচড়ায়, যা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। তাদের মতে, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা না থাকলে হয়তো সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতো। তাই তারা স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যপ্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি ছোট উপজেলার হাসপাতালের ভ্যাকসিন সংকট জাতীয় পর্যায়ের বড় সংকটের প্রতীক হতে পারে, কারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক স্তরের সেবা। সেখানে যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ বা টিকা না থাকে, তবে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য শিক্ষা হলো, বরাদ্দ অর্থ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবস্থাপনায় অবহেলা বা বিলম্ব সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সবশেষে স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, নতুন করে পাওয়া ভ্যাকসিন সরবরাহ শুধু সাময়িক সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যতে নিয়মিত সেবার নিশ্চয়তার সূচনা হবে। তারা চান, এমন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রী যেন কখনোই সংকটে না পড়ে এবং স্বাস্থ্যসেবা যেন মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকে। কারণ একটি ছোট অবহেলা কখনো কখনো একটি জীবন হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, আর সেই দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।