প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানুয়ারি মাসে আদালতের বিভিন্ন আদেশের ভিত্তিতে দেশ ও বিদেশে এক নজিরবিহীন পরিমাণ সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে। জানুয়ারি মাসে মোট ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদকে ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে ২৯টি আদেশ কমিশনে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ২২টি আদেশের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে এবং ১১টি আদেশে সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এসব আদেশে উল্লিখিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৬৯ দশমিক ২৬ একর জমি, চারটি ভবন, ছয়টি ফ্ল্যাট, দুইটি দোকান, একটি বাণিজ্যিক স্পেস, একটি এফডিআর, ছয়টি গাড়ি এবং একটি বীমা পলিসি। দেশের ভেতর ক্রোককৃত সম্পদের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এছাড়া ৭৯টি ব্যাংক ও সঞ্চয়ী হিসাবে মোট ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকার স্থিতি পাওয়া গেছে। আরও দুটি বিও হিসাব এবং ১২ লাখ টাকার শেয়ারও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে অবরুদ্ধ সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কমিশন জানায়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের সনাক্তকরণ, জব্দ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দুদক জানায়, শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৪৪টি ফ্ল্যাট, ফিলিপাইনে দুটি ফ্ল্যাট, ভারতে ৯টি ফ্ল্যাট, মালয়েশিয়ায় ৪৭টি বাণিজ্যিক স্পেস, কম্বোডিয়ায় ১১৭টি সম্পদ, থাইল্যান্ডে ২৩টি সম্পদ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৯টি সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে ৩৩টি অ্যাপার্টমেন্টও ক্রোক করা হয়েছে। এসব বিদেশে অবরুদ্ধ ও ক্রোককৃত স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
দুদক আরও জানায়, বিদেশে ১ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগও ক্রোক করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ২৬ হাজার টাকার সমতুল্য। কমিশন জানায়, দেশের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ চিহ্নিতকরণ, জব্দ ও সংরক্ষণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এফআইআর, চার্জশীট ও ফাইনাল রিপোর্টের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। জানুয়ারি মাসে ৪৬৭ জনের বিরুদ্ধে ৭৬টি এফআইআর, ১১০ জনের বিরুদ্ধে ৩৬টি চার্জশীট, ১১ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ৯টি ফাইনাল রিপোর্ট, ৯২টি নতুন অনুসন্ধান, ১৯টি পরিসমাপ্তি এবং ৩৮টি সম্পদ বিবরণীর আদেশ জারি করা হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এই কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও জানান, ক্রোক ও অবরুদ্ধকৃত সম্পদ সংরক্ষণ, পুনঃমূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতে আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুদকের এই কার্যক্রম শুধু অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করছে না, বরং সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদের অবৈধ সঞ্চয় রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছে। এছাড়া বিদেশে সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও তথ্য আদানপ্রদানের মাধ্যমে প্রবাসী সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
দুদক জানায়, দেশে ও বিদেশে সম্পদের ক্রোক ও অবরুদ্ধকরণের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত মাসিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন রাখা হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা হচ্ছে।
এই তথ্যের মাধ্যমে দেশের নাগরিকরা জানতে পারছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কঠোর হচ্ছে। দুদকের উদ্যোগের ফলে দেশের অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং অনৈতিক সম্পদের জটিলতা কমবে।