প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জয়পুরহাট: উত্তরের শস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাটে এবারও আলুর চাষে বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি ফোটেনি। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও আলুর বাজারে ধস নেমেছে। উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকরা, এমনকি পানির দরে আলু বিক্রি করেও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। মাঠে ফলন ঘরে তোলার ব্যস্ততা থাকলেও বাজারে নিম্নমূল্যের কারণে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার ধারকি ঘোনপাড়া গ্রামের কৃষক আজিজার রহমান বলেন, “গত বছর লাভের আশায় ১০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। প্রতিবস্তা ১৫০০ টাকায় রাখলেও উত্তোলনের সময় মাত্র ৫০০ টাকা পেয়েছি। এই ক্ষতি পোষাতে এবারও ৬ বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি, কিন্তু এবারও লাভ হলো না। প্রতি বিঘায় ৩৫–৪০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০–২৫ হাজার টাকায়।’’ তাদের অভিজ্ঞতা এটাই প্রমাণ করছে যে, আলু চাষে বিনিয়োগ করা অর্থ এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জয়পুরহাটের অন্যান্য কৃষকও একই অভিযোগ করছেন। সদর উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল সরদার, খাঁ পাড়ার আলম হোসেন ও সরদার পাড়ার এরশাদুল হক জানান, গত বছর আলুর দাম না পাওয়ায় তারা শত শত বস্তা আলু হিমাগারে ফেলে দিয়েছিলেন। তাই এবছরও আশা নিয়ে আলু লাগিয়েছেন, তবু লাভে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তারা জানিয়েছেন, আগামী বছর আর আলু চাষ করবেন না।
কিছু কৃষক ভবিষ্যতে আলু রফতানির আশায় আশাবাদী। কালাই উপজেলার মিজানুর রহমান, আব্দুল হাব ও নাহিদ ইসলাম মনে করেন, যদি জয়পুরহাটের আলু বিদেশে রফতানি করা যায় এবং আলু নির্ভর শিল্প কল কারখানা গড়ে ওঠে, তাহলে কৃষকেরা লোকসান থেকে বাঁচতে পারবেন। তারা এমপি ও মন্ত্রীদের সদিচ্ছার উপর জোর দিয়েছেন।
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বটতলী বাজারের পাইকারি আড়তদার মিজানুর রহমান বলেন, “মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম প্রতি মন ১২–১৩শ টাকা ছিল। এখন আলু প্রকারভেদে স্টিক ৩০০ টাকা, ১২–১৩ জাতের আলু ২৮০ টাকা এবং গ্র্যানুলা ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’’ বাজারে এই তীব্র মূল্যপতনের কারণে কৃষকরা হতাশ।
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ডা. মাহবুব হাফিজ বলেন, “সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ ও কম সুদের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আলু নির্ভর শিল্প কল গড়ে উঠতে পারবে। এতে বিদেশে রফতানি সহজ হবে এবং কৃষকরা লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।’’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম জানান, “আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জয়পুরহাটে এ বছর প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। যা থেকে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। যদিও ফলন বেশি হলেও দাম ও বিপণন সমস্যা কৃষকদের হতাশ করছে।’’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদেশে রফতানির মাধ্যমে আলু বাজার সম্প্রসারণ করলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।
জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, “এই সংকট নিরসনে জেলায় আলু নির্ভর একটি শিল্প কল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। উত্তরের সীমান্ত ঘেঁষা এই জেলা আলু উৎপাদনের জন্য অন্যতম। ধান চাষে কিছুটা লাভ হলেও আলু চাষে কৃষকরা খরচও তুলতে পারছেন না। কৃষকদের কথা চিন্তা করে আমরা আলু নির্ভর শিল্প কল গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা করছি।’’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জয়পুরহাটে এবার প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যা থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের আশা, সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তারা যদি সহায়তা করেন, তবে আলু চাষে লাভজনক শিল্পে রূপান্তর সম্ভব হবে এবং আলু বাজারে দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।