প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আবারও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে তার হস্তক্ষেপের কৃতিত্ব দাবি করেছেন। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি জানান, তার মধ্যস্থতার কারণে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত এড়ানো গেছে এবং ৩৫ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে। ট্রাম্পের এই দাবি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কংগ্রেসের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, “পরিস্থিতি পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারত। পাকিস্তান ও ভারত পারমাণবিক যুদ্ধে লিপ্ত হত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ জানিয়েছিলেন, আমার সম্পৃক্ততা না থাকলে ৩৫ মিলিয়ন মানুষ মারা যেত।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা গর্বের সাথে দেশে এবং বিদেশে আমেরিকানদের জন্য নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনছি। আমার প্রথম দশ মাসে, আমি আটটি যুদ্ধ শেষ করেছি, এবং পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানো হয়েছে।”
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত শুরু হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করে। সেই সময় থেকে ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছেন যে, ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনা শিথিল করতে তার প্রশাসন সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতা করেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে, যদিও নয়াদিল্লি এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
পাহেলগাম হামলার পর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। ওই সংঘাতে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ভারত হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে, যা পাকিস্তান অস্বীকার করে। দুই দেশের পাল্টা হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। কয়েকদিনের সংঘর্ষের পর ট্রাম্প তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, এই মধ্যস্থতার ফলে পারমাণবিক ঝুঁকি এবং ব্যাপক মানবিক ক্ষতির সম্ভাবনা এড়ানো গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের দাবি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও মধ্যস্থতার গুরুত্বকে তুলে ধরছে। তবে অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলছেন, এক দেশের প্রেসিডেন্টের এমন দাবিকে একপক্ষীয় হিসেবে দেখা উচিত, এবং সংঘাতের ইতিহাস, দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই নিজেদের সশস্ত্র নীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে কৌশলগত কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার জটিলতা। তিনি দাবি করেছেন যে, তার প্রশাসন বিভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করে উভয় দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে, যা পারমাণবিক উত্তেজনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করাচ্ছেন, এই ধরনের দাবি সাধারণত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে এবং বাস্তব প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।
দু’দেশের মধ্যবর্তী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে সামরিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ যদি সত্যিই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে, তবে এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কৌশলগত প্রভাবকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরবে।
ইতিহাসে দেখা গেছে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক সংক্রান্ত উত্তেজনা বহুবার সমাধান ও মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিক শক্তি। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি তার প্রশাসনের সময়কালে এই মধ্যস্থতার জন্য নিজেকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছেন এবং সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় রোধে ভূমিকা রেখেছেন। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই প্রশংসা করেছেন, তবে সমালোচকরা বলেছেন, প্রতিটি সংঘাতের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার দায় এক দেশকেই দেয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সমাধান বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে সম্ভব, এক দেশের নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে তা সম্পূর্ণ করা কঠিন।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ নজর রাখছে, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অঞ্চল বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের ভাষণ পরবর্তী সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক সংঘাত এড়াতে ও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি শুধুমাত্র এক দেশের রাজনৈতিক দাবির মাধ্যমে নয়, বৈশ্বিক কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব।