প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও নৃশংস ঘটনার মধ্যে একটি হলো ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড। সেই সময়ে বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক দেশের সামরিক সদস্য প্রাণ হারান। এই ঘটনাকে ঘিরে আজও রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা থামেনি। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আয়োজনে পিলখানায় নিহতদের স্মরণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এ ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করেন।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “এ হত্যাকাণ্ড শুধু ডাল-ভাতের জন্য ঘটানো হয়নি। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যা, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং ভারতের প্রভাব বাড়ানো। সেই সময় যারা অভিযুক্ত ছিলেন, তাদের এখনও বিচারের আওতায় আনা হয়নি। বহু নিরপরাধ ব্যক্তি কারাগারে কেটে দিয়েছে তাদের জীবন। সরকারকে আহ্বান জানাই, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনুন।” তিনি আরও বলেন, পিলখানার নৃশংসতা একটি রাষ্ট্রনৈতিক ও সামরিক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা ছিল দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যদের হত্যা করে দেশের সীমানাকে অরক্ষিত করা।
রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতার খেলায় যে দলগুলো শীর্ষে উঠে এসেছে, তারা মনে করে দেশটা তাদের জমিদারি। তিনি বলেন, ভোট দিয়ে নির্বাচিত হয়েছে যাদের, ক্ষমতা পেয়েছে অন্যরা। দেশে কী ধরনের নির্বাচন হয়েছে তা জনগণ ভালোভাবে জানে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি নতুন সরকারকে সতর্ক করেছেন যে ক্ষমতায় আসার পরও যদি আগের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত সমর্থন আর দেবে না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন চাঁদাবাজি বন্ধ করবেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি একজন মন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে সমঝোতার মাধ্যমে চাঁদা নিলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না। তাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। রফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “নতুন সরকারও দলীয়করণের কাজ শুরু করেছে। মনে হচ্ছে তারা আগের সরকারের প্রথা থেকে শিক্ষা নিয়েছে।”
এ সময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও রহস্যের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট কোনো কারণে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সত্যিটিকে চাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে। সেই সময়কার বিডিআর সদস্যদের অনেককে বিনা অপরাধে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা হয়েছে। তাদের মুক্তি দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি।”
রফিকুল ইসলাম আরও জানান, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনার দিকে নজর দিতে হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এবং সেনাপ্রধানের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্তে আনতে হবে। তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সামরিক শক্তি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষ হত্যা করে কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।”
জামায়াতের এই নেতারা সবাই একমত যে, দেশকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। রফিকুল ইসলাম বলেন, “নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটবে না। প্রয়োজন, পুরো ঘটনা খোলাখুলি তদন্ত করা এবং সত্যকে সামনে আনা।”
জামায়াতের উভয় নেতাই মনে করিয়ে দেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড শুধু সামরিক বিদ্রোহ নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের অংশ। তারা জনগণকে এই ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রশাসনকে দায়িত্ব পালনের জন্য তৎপর থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও প্রভাব এখনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক জটিলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সঠিক বিচার নিশ্চিত করা, দেশের সামরিক ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। জামায়াতের নেতারা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, রাষ্ট্র ও সরকারের উচিত প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, যাতে জাতি ক্ষতগ্রস্ত পরিবার ও সমাজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
এ ঘটনা শুধু ইতিহাস নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা যে দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রশাসন কতটা সতর্ক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে অপরিহার্য।