প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা বাণিজ্য চুক্তির প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণ করা হবে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতি এখনো বিকাশমান। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সব দেশের জন্য ১৫ শতাংশ ট্যারিফ প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনো লিখিত নথি বাংলাদেশের হাতে পৌঁছায়নি। এর আগে নির্দিষ্ট দেশভেদে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ কার্যকর ছিল। নতুন ট্যারিফ ১৫ শতাংশে সমান হওয়ার কারণে এটি সব দেশের জন্য অভিন্ন হবে। মন্ত্রী এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট ছিল আলোচনা চলাকালীন সময়ে। পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল, তাই দেশের স্বার্থে এখনই কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তির সব ধারা যে আমাদের পক্ষে থাকবে তা নয়; দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিদেশ থেকে যে পণ্যগুলো দেশে এনে বাজারে সরবরাহ করে, সেগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কিছু অসাধু বিক্রেতা পরিস্থিতির সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেন।” লেবুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এমন একটি উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, চার-পঞ্চাশ টাকার লেবু হঠাৎ ১২০ টাকায় পৌঁছেছিল। তিনি স্পষ্ট করেছেন, সরবরাহ সংকট ছিল না, তাই দাম বেড়ে যাওয়া নিছক সুযোগসন্ধানী কার্যক্রম। তিন দিনের মধ্যেই দাম আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, যা প্রমাণ করে কিছু ব্যক্তি বাজারে অযৌক্তিক লাভের চেষ্টা করেছিলেন।
চাঁদাবাজি ও বাজারে অবৈধ লেনদেন রোধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি কেবল মুখে আশ্বাস দেবেন না, বরং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করবেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, টিসিবি পণ্য কিনতে গিয়ে হুড়োহুড়ির ঘটনায় দুজন নারী আহত হওয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক মনে করছেন এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে পণ্য বিতরণ প্রক্রিয়ায় আরও শৃঙ্খলা এবং সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ সময় সাংবাদিকদের সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চুক্তি আলোচনা সংবেদনশীল প্রকৃতির, তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে প্রয়োজন ছাড়া মন্তব্য এড়ানো উচিত। তিনি বলেন, “চুক্তির ধারা বিশ্লেষণ করে দেশের পক্ষে যেসব সুবিধাজনক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, সেগুলো করা হবে এবং যেসব পক্ষে নয়, সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করা হবে।”
সরকারের এই উদ্যোগকে দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রদায় এবং সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশি বাণিজ্য চুক্তির প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হলে তা দেশের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও বাজার স্থিতিশীলতায় সহায়ক হবে। তারা আশা করছেন, নতুন ট্যারিফ নীতির ফলে দেশের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি পণ্যের স্বল্পসাপ্লাই বা দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক থাকার গুরুত্বেও জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, চাহিদা-যোগান বিশ্লেষণ করে বাজারে যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই বিপণন ব্যবস্থায় সতর্কতা জারি করেছে এবং অসাধু বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন এবং ট্যারিফ নীতি পর্যবেক্ষণ করলে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হবে। এছাড়া, স্থানীয় বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং জনগণকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুক্তাদির উল্লেখ করেছেন, “চুক্তির সব দিক বিবেচনা করে দেশীয় অর্থনীতিকে সর্বাধিক সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হবে। এছাড়া, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা বা চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ কার্যকরভাবে নেওয়া হবে।” তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ সরকার বিদেশি চুক্তি ও অভ্যন্তরীণ বাজার উভয় ক্ষেত্রেই সচেতন ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের পথে রয়েছে।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা, নতুন ট্যারিফ নীতি পর্যবেক্ষণ, এবং দেশীয় বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সরকার সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।