আখের অভাবে বন্ধ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
আখের অভাবে বন্ধ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরের লালপুরে অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল চলতি মৌসুমে আখের ঘাটতির কারণে অকাল বন্ধ ঘোষণা করেছে। গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে মিল কর্তৃপক্ষ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই বন্ধ ঘোষণা আসতে আরও ১৩ কর্মদিবস বাকি ছিল। মিল সূত্র জানায়, গত বছরের ১০ নভেম্বর শুরু হওয়া ২০২৫-২৬ মৌসুমে মিলের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ১২১ কর্মদিবসে ১৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা। চিনি আহরণের হার ধরা হয়েছিল ৬.৫ শতাংশ।

মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত মিলটি ১০৮ কর্মদিবসে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন হারে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করতে সক্ষম হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছে, যা লক্ষ্য থেকে কিছুটা কম। চিনি আহরণের হার দাঁড়িয়েছে ৫.৬ শতাংশ। এই পার্থক্য মিলের কর্তৃপক্ষকে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ করেছে।

মিলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) আসহাব উদ্দিন বলেন, “চলতি মৌসুমে মিল এলাকায় মোট ১৮ হাজার একর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ আখ থাকা সত্ত্বেও আশপাশের নাটোর ও রাজশাহী অঞ্চলের অন্যান্য সুগার মিলগুলো দালালদের মাধ্যমে হাজার হাজার মেট্রিক টন আখ চলে যাওয়ায় আমরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারিনি।” তিনি আরও জানান, আখের ঘাটতির কারণে মিলের উৎপাদন পরিকল্পনা কিছুটা ব্যাহত হলেও চাষীদের সঙ্গে অর্থিক লেনদেন ঠিকঠাক সম্পন্ন করা হয়েছে।

মৌসুম চলাকালীন সময়ে প্রতি কুইন্টাল চিনি উৎপাদনের মূল্য ২৫ টাকা বৃদ্ধি করে ৬০০ টাকা থেকে ৬২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৫ হাজার আখ চাষীর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে চাষীদের মধ্যে মোট ১৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা আখ চাষ ও শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তায় সহায়ক হয়েছে।

চলতি মৌসুমের এই অকাল বন্ধ ঘোষণা প্রভাব ফেলেছে স্থানীয় চাষী, শ্রমিক ও মিলের সরবরাহ শৃঙ্খলায়। চাষীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একজন চাষী বলেন, “আমাদের যথেষ্ট আখ ছিল, কিন্তু দালালদের কারণে মিলের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। আশা করছি পরবর্তী মৌসুমে আরও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” শ্রমিকরাও জানান, অকাল বন্ধ ঘোষণা তাদের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে, তবে তারা আশা করছেন মিল কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে অর্থ প্রদান ও সমাধান করবে।

মিলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) আসহাব উদ্দিন বলেন, “আমরা কেবল আখ সংগ্রহ ও মাড়াইয়ে মনোনিবেশ করি। চাষীদের সহযোগিতা ছাড়া মিলের উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। আগামী মৌসুমে আমরা আখ সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেব।” তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, আখ চাষীদের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা করা হবে এবং উৎপাদন হার বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের এই অকাল বন্ধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি সতর্কবার্তা। আখের ঘাটতি এবং দালালদের মাধ্যমে উৎপাদিত আখ অন্য মিলগুলোতে চলে যাওয়ায় চূড়ান্ত উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সুগার মিলের জন্য আখের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, নইলে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। এছাড়া, স্থানীয় অর্থনীতিতে এটি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মিলের এই পরিস্থিতি থেকে দেখা যায়, শুধু আখ উৎপাদনই যথেষ্ট নয়, বরং আখের সুষ্ঠু সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দালালদের মাধ্যমে আখ অন্য মিলগুলোতে চলে যাওয়া স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনাকে ব্যাহত করেছে। এ ক্ষেত্রে মিল কর্তৃপক্ষের পক্ষে সঠিক নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চাহিদাপূর্ণ।

সামগ্রিকভাবে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়া চিহ্নিত করেছে যে আখ সরবরাহ, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মিল কর্তৃপক্ষ এবং চাষীরা আশা করছেন, পরবর্তী মৌসুমে এই ধরনের সমস্যা এড়াতে আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হবে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের অকাল বন্ধের প্রভাব শুধুমাত্র মিল ও চাষীদের সীমিত নয়; স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। চিনি উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহও কমে যায়, যা চিনি মূল্যের ওঠাপড়া এবং শ্রমিকদের আয় প্রভাবিত করে। এ জন্য মিল কর্তৃপক্ষকে চাষীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বজায় রাখতে হবে এবং দালাল কার্যক্রম প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

উপরন্তু, চলতি মৌসুমে ১৫ হাজার চাষীর বিল পরিশোধ এবং ১৫ কোটি টাকার বিতরণ এই মিলের আর্থিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়। এটি চাষী ও শ্রমিকদের আস্থা ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে। পরবর্তী মৌসুমে এই প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হলে আখ উৎপাদন ও চিনি মাড়াইয়ের লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের চলতি মৌসুমের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—কেবল আখের পর্যাপ্ত উৎপাদনই নয়, সঠিক বণ্টন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া মিলের উৎপাদন লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। চাষী ও শ্রমিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা, মিল কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক সহায়তা একত্রে হলে চিনি উৎপাদন, আখের বাজার এবং স্থানীয় অর্থনীতি সকলেই লাভবান হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত