সামাজিক যোগাযোগ আসক্তি না অভ্যাস, কীভাবে কমাবেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
সামাজিক যোগাযোগ আসক্তি না অভ্যাস, কীভাবে কমাবেন

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার প্রতিদিনের জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাটসহ নানা প্ল্যাটফর্মে মানুষ দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেন। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার কখনও কখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ব্যক্তির মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে জুয়া, ওপিওয়েড বা সিগারেটের আসক্তির সঙ্গে তুলনা করেন। তবে ‘অতিরিক্ত ব্যবহার’ আর ‘আসক্তি’—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা এখনও নির্ধারিত নয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের অ্যাডিকশন মেডিসিন বিভাগের পরিচালক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেমকের মতে, কোনো পদার্থ বা আচরণের প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন নির্ভরশীলতাই আসক্তি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্ষতি জানলেও যদি কেউ কোনো আচরণ অব্যাহত রাখে, তা আসক্তির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোগ হিসেবে স্বীকৃত নয়। ‘ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডার্স’-এও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি প্রকাশ্যে স্বীকৃত নয়। তারপরও বিশেষজ্ঞরা একমত যে, অতিরিক্ত ব্যবহার ক্ষতিকর হতে পারে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের মনোরোগ ও বিহেভিরিয়াল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক লরেল উইলিয়ামস বলেন, একজন ব্যক্তি যদি অনুভব করেন যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা তার দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক বা শখকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তবে এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। একই সঙ্গে, ব্যবহারকারীরা যদি নিয়মিতভাবে ক্লান্ত, হতাশ, উদ্বিগ্ন বা রাগান্বিত অনুভব করেন, তাহলে নিজেদের ব্যবহার পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, যদি কেউ কাজ ফেলে বারবার ফোনে নজর দিচ্ছেন, ব্যবহার কমানোর চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে, এবং ব্যবহার নিয়ে অপরাধবোধ অনুভব করছেন, তাহলে এটি ইতিবাচক প্রমাণ যে আচার বা ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কমানোর প্রথম ধাপ হচ্ছে সচেতনতা বৃদ্ধি। ব্যবহারকারীদের বোঝা উচিত, এই প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি এবং ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নকশা করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক ইয়ান এ অ্যান্ডারসনের মতে, ছোট কিন্তু অর্থবহ পরিবর্তন শুরু করতে পারে। যেমন ফোনের হোম স্ক্রিনে অ্যাপের অবস্থান পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা বা শোবার ঘরে ফোন না নেওয়া। এই ‘হালকা’ পদক্ষেপও ব্যবহার কমাতে সহায়ক।

প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করাও কার্যকর হতে পারে। আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড উভয় প্ল্যাটফর্মেই স্ক্রিন টাইম বা ব্যবহার সীমিত করার ফিচার রয়েছে। ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন বা অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করতে পারেন। যদিও এটি সহজে অতিক্রম করা যায়, তবু এটি ব্যবহারকারীদের সচেতন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

যদি হালকা পদক্ষেপে কাজ না হয়, তবে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিতে হতে পারে। কিছু ব্যবহারকারী ফোনকে গ্রে স্কেলে রূপান্তর করেন যাতে দৃশ্যমান আকর্ষণ কমে। কেউ কেউ স্মার্টফোন বদলে সাধারণ ফিচার ফোন ব্যবহার শুরু করেন। এছাড়া বাজারে এমন ডিভাইসও এসেছে যা নির্দিষ্ট অ্যাপ খোলার জন্য বাধা তৈরি করে। এমন ডিভাইস ব্যবহারে ফোন খোলার আগে একবার ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। কেউ চাইলে ফোনকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লকবাক্সে রাখতে পারেন।

অতিরিক্ত ব্যবহার অনেক সময় ব্যক্তির উদ্বেগ, একাকিত্ব, বিষণ্নতা বা আত্মসম্মানবোধের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে বাস্তব সময় কাটানো, শারীরিক কর্মকাণ্ড, শখ ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করলে ভার্চুয়াল নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে। বাস্তব জীবনের পরিসর যত বাড়বে, মনস্তাত্ত্বিক ভার্চুয়াল নির্ভরতা তত কমে যাবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধুমাত্র সময়ের অপচয় নয়, এটি ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্ক এবং সামাজিক যোগসূত্রের উপরও প্রভাব ফেলে। তাই সচেতন ব্যবহার, নিয়মিত বিরতি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নিজস্ব লক্ষ্য, সময়সূচি এবং বাস্তব জীবনের কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সীমিত করা সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি না অভ্যাস—এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সচেতন ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। নিজেকে প্রশ্ন করা এবং ব্যবহার সীমিত করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা, ব্যক্তির মানসিক ও সামাজিক জীবনে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত